সাঁওতাল সমাজে কিস্কু ও মান্ডি বংশের কথা

সাঁওতাল সমাজে কিস্কু বংশের সঙ্গে মান্ডি বংশের এবং টুডু বংশের সঙ্গে বেসরা বংশের বিবাহ নিষিদ্ধ। জম সিম বিন্‌তী কথনের সময়ে এই নিষিদ্ধ বিবাহ সম্পর্কে অতীতের ঘটনা উল্লেখ করা হয়। বিন্‌তী গুরু বলেনঃ

এক কিস্কু রাজার এক বিবাহ যোগ্য কন্যা ছিল। কিন্তু দেশে সেই রকম সঙ্গতিসম্পন্ন পাত্র না থাকায় কেউ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে কিস্কু রাজার কাছে আসেনি। সবাই রাজকুমারীর বিয়ের আশা ছেড়ে দিয়েছিল। সেই সময়ে দেশে কৃষি কাজের ভার ছিল মান্ডি বংশের উপর, তারাই ছিল দেশের জমিদার। মান্ডি বংশের একটি মাত্র ছেলে, বিবাহ করার মত বয়স হয়েছিল। কিন্তু চেহারা মোটেই ভালো ছিল না, আর পায়ে ছিল মস্ত গোদ। তবে তার চুল ছিল খুব লম্বা আর ঘন কালো।

একদিন নদীতে স্নান করার সময়ে মান্ডি ছেলেটির মাথার একটি চুল জলে পড়ল। সে তখন ভাবল, তার এই লম্বা চুলটি যদি জলে ভেসে যায়, তাহলে চুলে জড়িয়ে বহু মাছ মরতে পারে। এই অকারণ প্রাণী হত্যার দায় এড়াবার জন্য সে তখন চুলটি একটি পাতার মধ্যে মুড়ে নদীর জলে ভাসিয়ে দিল।

নদীর নীচের দিকে ঘাটে কিস্কু রাজকুমারী তার বান্ধবীদের নিয়ে স্নান করছিল। হঠাৎ নদীর জলে পাতার ওই পুঁটলিটা ভেসে যাচ্ছে দেখে সখিকে পুঁটলিটি তুলতে বলল। রাজকুমারী পাতার মোড়ক খুলে দেখল যে, একটি ঘন কালো বারো হাত লম্বা চুল তার মধ্যে রয়েছে। এত বড় আর এতো সুন্দর চুল দেখে রাজকুমারী তখন বলল- “সই, এই চুল যদি কোন মেয়ের হয় তবে তার সঙ্গে ‘ফুল’ পাতাবো আর যদি কোন ছেলের হয় তবে তাকেই আমি বিয়ে করব।”

ঘরে ফিরে রাজকন্যা তার বাবা-মায়ের কাছে একথা বলল। রাজকন্যার প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য চারিদিকে লোক পাঠানো হলো এবং শেষে মান্ডি বংশের ছেলেটির সন্ধান মিলল। কিস্কু রাজার সাঁওতাল রীতি অনুযায়ী রায়বার অর্থাৎ ঘটক নিয়োগ করলেন, উভয় পক্ষের দেখা সাক্ষাতের ব্যবস্থা হল। ছেলের বাড়ির অবস্থা দেখে কিস্কু রাজ খুশি, ছেলের পায়ের দিকে কেউ আর তাকালো না।

বিয়ের দিন ধার্য হল এবং কিস্কু রাজ কন্যা সঙ্গে মান্ডি ছেলের বিয়ে ও হয়ে গেল। কিন্তু ছেলের পারো আবার সময় সব জানাজানি হয়ে গেল। মেয়ের মা বাবা তখন মেয়েকে আর শ্বশুরবাড়ির পাঠাতে রাজি হলেন না। এই ঘটনাকে শোকেন্দ্র করে মান্ডিদের সঙ্গে কিস্কু দের বিবাদ শুরু হল এবং তা চলতে লাগল।

একদিন কিস্কুরা ঘোড়ার নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গেছে। ঘোড়াটিকে নদীর পাড়ে রেখে তারা নদীতে মাছ ধরতে নেমেছে এমন সময় মান্ডিরা চুপি চুপি ঘোড়াটিকে নিয়ে পালিয়ে গেল। কিস্কুরা মাছ ধরা শেষ করে পাড়ে উঠে দেখে যে তাদের ঘোড়া নেই। হঠাৎ সে সময়ে আকাশে শঙ্খচিলের ডাক শোনা গেল। শঙ্খচিলের ডাক অনেকটা ঘোড়ার ডাকের মতই। তাই যেদিক থেকে ডাক শোনা যাচ্ছিল তারা সেদিকেই ছুটল। শেষ পর্যন্ত তারা এসে হাজির হলো মান্ডি গাঁয়ে। কিন্তু ঘোড়ার সন্ধান পেল না। তবে তারা নিশ্চিত হলো যে এ কাজ মান্ডিরাই করেছে এবং ঘোড়া লুকিয়ে রেখেছে। এ ঘটনার পর এই মান্ডিদের সঙ্গে কিস্কুদের চিরকালের মত বিচ্ছেদ ঘটল আর তারা মান্ডি বংশের সঙ্গে কিস্কু বংশের বিবাহ চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করল।

(সাঁওতালি ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস – ধীরেন্দ্রনাথ বাস্কে, পৃষ্ঠা ১৮৫-১৮৭)

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *