Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.

মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ ‘অস্ত্রলাভ’

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের দ্বিতীয় সর্গের নাম কবি দিয়েছেন ‘অস্ত্রলাভ’। নামকরণটি শিল্পসঙ্গত হয়েছে কিনা তার পর্যালােচনায় এ সর্গে উপস্থাপিত ঘটনাধারার সমায়ােজনটি লক্ষ্য করা দরকার।

দ্বিতীয় সর্গের কথারম্ভ দেবদেবী বন্দনা বা পূর্বজ কবিদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপনের মধ্যে দিয়ে শুরু হয়নি, হয়েছে প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে এবং তা সান্ধ্য বা নৈশ প্রকৃতিঃ

‘অস্তে গেলা দিনমণি; আইলা গােধূলি একটি রতন ভালে।’

আকাশে সন্ধ্যাতারা, সান্দ্র আঁধারে শালুক মেলেছে তার পাপড়ি, পদ্ম বুজে গেছে। পাখিরা ফিরেছে বাসায়, গােষ্ঠে ফিরেছে গাভীকুল। সময় গড়িয়ে চাঁদ উঠেছে আকাশে। সেখানে তারার ভীড়। পেলব হয়েছে নানাফুলের গন্ধমাখা বাতাস। চঞ্চল শিশুর ক্লান্ত হয়ে মায়ের কোলে ঘুমে ঢলে পড়ার মতাে, সমাগতা দেবী নিদ্রার কোলে আত্মদান করেছে। স্থলচর-জলচর জীবকুল।

স্বর্গে তখন বসেছে দেবসভা। সমাজে হৈমাসনে দেবরাজ ইন্দ্র, বামে ইন্দ্রানী। স্বর্গীয় বাজনার অনুষঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করছে উর্বশী, রম্ভা, চিত্রলেখা, মিশ্রকেশী প্রভৃতি অঙ্গরারা। স্বর্ণপাত্রে অমৃতপান শুরু হয়েছে, এসেছে স্বর্গীয় ভােজন; দেবতারা মত্ত হয়েছেন পান, ভােজন ও নৃত্য-দর্শনে। এমন সময় সেখানে এসে উপস্থিত হলেন দেবী লক্ষ্মী। স্মরণ্য যে প্রথম সর্গের শেষে মেঘনাদ-ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে প্রমােদকাননে মেঘনাদকে বীরবাহুর মৃত্যু সংবাদ দিয়ে লক্ষ্মী তাকে লঙ্কায় যেতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। মেঘনাদের লঙ্কা যাত্রার পরই তিনি চলে এসেছেন স্বর্গে ইন্দ্রের সভায়। স্তুতি ও পাবন্দনা শেষে ইন্দ্র তার আগমনের কারণ জানতে চাইলে লক্ষ্মী জানিয়েছেন যে বহুকাল তিনি রক্ষোরাজ রাবণের ভক্তিতে লঙ্কায় অচলা। কিন্তু বিধি এখন রাবণের প্রতি বিরূপ। নিজ কর্মদোষে সবংশে ধ্বংস হতে চলেছে সে। তবু যতদিন সে মারা না যায়, লক্ষ্মী তার গৃহ থেকে মুক্তি পাবেন না। সব বীর নিহত হয়েছে, বেঁচে আছে কেবল ইন্দ্রজিৎ। সে না-নিহত হওয়া অবধি রাবণের মৃত্যু আসন্ন হতে পারে না। রাবণ আজ তাকেই সেনাপতি পদে অভিষেক করেছে। নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সমাধা করে মেঘনাদ যদি যুদ্ধে যায় তবে রামচন্দ্রের পক্ষে তাকে হারানাে অসম্ভব। রামচন্দ্রকে কিভাবে রক্ষা করা যায়, লক্ষ্মী ইন্দ্রকে তা ভেবে দেখতে বলেন।

ইন্দ্র বলেন, মহাদেব ছাড়া এ বিপদে আর কোনাে ত্রাতা নেই! সাপেরা গরুড়কে যত ভয় পায় তার চেয়ে বেশি তিনি নিজে ভয় পান ইন্দ্রজিৎকে, কারণ যে-বজ্রে তিনি। বৃত্রাসুরকে পরাস্ত করেছিলেন, মেঘনাদ সেই বজ্রকেও ব্যর্থ করে। ব্রহ্মার বরে সে সর্বজয়ী। ইন্দ্র কৈলাসে যাওয়ার অনুমতি চাইলে লক্ষ্মী তঁাকে বলেন ইন্দ্র যেন মহাদবের কাছে একথাও নিবেদন করেন যে বসুন্ধরা সতী আর পাপের ভার বইতে পারছেন না, অনন্ত নাগও পৃথিবীকে ধারণ করে থাকতে পারছে না আর, রাবণ না মারা গেলে পৃথিবী থেকে পাপের ভার কমবে না। তিনি আরও বলতে বলেন যে লক্ষ্মী বহুদিন বৈকুণ্ঠপুরী ছাড়া, কোন পিতা ঢান কন্যা পতিগৃহ থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকুক।

ইন্দ্র কিন্তু একা কৈলাসে যান নি, সঙ্গে নিয়ে গেছেন ইন্দ্রাণীকে। শিব তখন যােগাসন নামে গিরিশৃঙ্গে তপােমগ্ন। গৃহে পার্বতী বসে ছিলেন স্বর্ণসিংহাসনে। সপত্নীক ইন্দ্র তার পাদবন্দনা শেষে তাদের আগমনের হেতু বর্ণনা করলেন এবং বললেন, ‘তুমি কৃপা না করিলে, কালি / অরান করিবে ভব দুরন্ত রাবণি।’ পার্বতী প্রথমটায় ইন্দ্রের কথায় গুরুত্ব দিলেন না, কারণ রাবণ শিবভক্ত। ইন্দ্র এবার কৌশল বদল করলেন, সীতার দুঃখের উপর গুরুত্ব দিয়ে পার্বতীর নারী-মনকে দ্রবিত করতে চাইলেন। বললেন, রাবণ দেবদ্রোহী, অধর্মাচারী, পরস্ত্রী-লােলুপ; দরিদ্র রানের একমাত্র ধনকে সে ছলনা করে অপহরণ করেছে; শিবের বরে সে দেবতাদের তুচ্ছজ্ঞান করে। তাকে দয়া করা কখনােই উচিত নয়। ইন্দ্রাণীও সীতার দুঃখের উপর জোর দিয়ে প্রার্থনা করলেন ইন্দ্রজিংকে হত্যা করে কাত্যায়নী সীতাকে রামের হাতে ফিরিয়ে দিন।

সব শােনার পরও পার্বতী বলেন ‘মাের সাধ্য নহে সাধিতে এ কার্য’, মহাদেব-রক্ষিত বংশের ব্যাপারে তিনি নিজে ছাড়া আর কেউ ইন্দ্রের বা ইন্দ্রাণীর বাসনা পূরণ করতে পারবে । আর, মহাদেব যেখানে আছেন সেই যােগাসনে তাে গরুড়ও যেতে পারে না। ইন্দ্র এবং তার পত্নীর অনুরােধ-উপরােধকে যখন এইভাবে প্রত্যাখ্যাত করছিলেন কাত্যায়নী, তখনি তাঁর পুরী সুগন্ধে—ঘণ্টাধ্বনিতে পূর্ণ হয়ে উঠল; সখী বিজয়া খড়ি গণনা করে দেখলেন মর্তে রামচন্দ্র নীলপদ্মাদি অর্ঘ্যে ভক্তিভরে দেবীর অকালবােধন করছেন। এই পূজারাধনায় তুষ্ট হয়ে পার্বতী মহাদেবের নিকট যেতে প্রস্তুত হলেন। রতির সাহায্যে মােহিনী-বেশ ধারণ করে মদনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চললেন মহাদেবের কাছে। |

কৈলাসের ভীষণ গিরিশৃঙ্গে যােগাসনে পৌঁছে পার্বতী বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত ধ্যানমগ্ন মহাদেবকে কামশরে জর্জরিত করতে আদেশ দিলেন মদনকে। মদনের সম্মােহন-শরে মহাদেবের জটা কেঁপে উঠল, কপালে প্রজ্জলিত হল নেত্রবহ্নি। মদন ভয়ে লুকিয়ে গেলেন পার্বতীর বুকের মধ্যে—কিন্তু ধ্যানভঙ্গের পর মােহিনীমূর্তি পার্বতীকে দেখে মহাদেব কুমারসম্ভব কাব্যের মতাে ক্রুদ্ধ হলেন না, সাদর সম্ভাষণে মৃর্গচর্মাসনে পাশে বসালেন পার্বতীকে। সাথে সাথে যােগাসন শৃঙ্গে বসন্ত আবির্ভূত হল। উমার বুকের মধ্যে থেকে এই মুহূর্তে মদন গােপনে অরেকটি তীর মারলেন মহাদেবকে। মহাদেব প্রেমামােদে মত্ত হলেন। মােহনরূপ ধারণ করে উমাকে তিনি বললেন উমার আগমনের উদ্দেশ্য তার জানা। রামচন্দ্র কেন পূজো করছে কাত্যায়নীর, কেন ইন্দ্ৰ কৈলাসে এসেছেন—কিছুই অজানা নেই। রাবণ তার পরমভক্ত বটে কিন্তু নিজ কর্মফলেই সে মজেছে। দেবতা বা মানুষ কেউই পূর্বকৃতের ফলভােগ থেকে অব্যাহতি পায় না। উমাকে তিনি বললেন মদনকে ইন্দ্রের কাছে দ্রুত পাঠিয়ে দিতে, ইন্দ্র সত্বর। মায়াদেবীর কাছে যান, মায়ার আশীর্বাদে লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদকে।

মদনের মাধ্যমে শিব-নির্দেশ জানতে পেরে ইন্দ্র মায়ার কাছে গেলেন এবং তার বন্দনা করে তাকে শিববার্তা অবগত করালেন, জানতে চাইলেন কি করে লক্ষ্মণ মেঘনাদকে হত্যা করবে। মায়া একটু চিন্তা করে বললেন, তারকাসুর তাকে পরাস্ত করে স্বর্গ কেড়ে নিলে দেবসেনাপতি রূপে কার্তিকের জন্ম হয়! মহাদেব স্বয়ং তাঁকে যুদ্ধে সাজিয়ে দেন এবং নিজের শক্তি দিয়ে অস্ত্র সৃষ্টি করে দেন তাঁকে। সােনার ঢাল, তরবারি, অক্ষয় তৃণীর ও ধনু। এই অস্ত্র দিয়েই কার্তিক তারকাসুরকে পরাজিত করেছিলেন। এই অস্ত্রেই মেঘনাদের মৃত্যু হবে। মায়া জানান তিনি নিজে লঙ্কায় গিয়ে লক্ষ্মণকে রক্ষা করবেন।

সেই অস্ত্রসমূহ নিয়ে মহানন্দে স্বর্গে চলে এলেন ইন্দ্র এবং চিত্ররথকে দিয়ে সেই অস্ত্র পাঠিয়ে দিলেন রামচন্দ্রের কাছে। রামকে তিনি জানাতে বললেন, মায়ার সাহায্যে লক্ষ্মণ মেঘনাদকে হত্যা করবে, কারণ দেবতারা রামের মঙ্গলাকাঙক্ষী, স্বয়ং অভয়াও তার প্রতি প্রসন্ন। মেঘনাদ মরলেই রাবণ মরবে, আর তখনই রাম সীতাকে ফিরে পাবেন। অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার সময় চিত্ররথকে লঙ্কার কেউ দেখতে না পায় তারও ব্যবস্থা করলেন ইন্দ্র। বায়ু-বিদুৎ-বক্সে সমুদ্র-অরণ্য-আকাশ-ভূধর মােদিনী জুড়ে ভয়ঙ্কর দুর্যোগের শুরু হল। সেই দারুণ দুর্যোগে রাক্ষসেরা ঘরে ঢুকে পড়ল। সবার অলক্ষ্যে চিত্ররথ দৈব-অস্ত্র নিয়ে এলেন রামের কাছে, জানালেন ইন্দ্রের বার্তা। চিত্ররথের প্রস্থানের পরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেমে গেল; আকাশে আবার চাদ ও তারা দেখে লঙ্কা প্রসন্ন হল, শালুক ভাসল জলে, পদ্ম হেসে উঠল। যুদ্ধক্ষেত্রে ছুটে এল শবাহারী শেয়াল, গৃধিনী, শকুনি, পিশাচের দল। ভীষণ অস্ত্র হাতে নিয়ে বীরমদে মত্ত হয়ে বেরিয়ে এল রাক্ষসেরা।

মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য – কৃষ্ণগোপাল রায়

আরো পড়তে পারেন

Spread the love

13 thoughts on “মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ ‘অস্ত্রলাভ’”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ 'অভিষেক'

  2. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু চতুর্থ সর্গ 'অশোকবন'

  3. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ 'সমাগম'

  4. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু সপ্তম সর্গ 'শক্তিনির্ভেদ'

  5. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু নবম সর্গ 'সংস্ক্রিয়া'

  6. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র - Debota Hembram

  7. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু নবম সর্গ ‘সংস্ক্রিয়া’ - Debota Hembram

  8. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু অষ্টম সর্গ ‘প্রেতপুরী’ - Debota Hembram

  9. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু সপ্তম সর্গ ‘শক্তিনির্ভেদ’ - Debota Hembram

  10. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ সর্গ ‘বধ’ - Debota Hembram

  11. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু পঞ্চম সর্গ ‘উদ্যোগ’ - Debota Hembram

  12. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’ – Debota Hembram

  13. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’ » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *