মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু অষ্টম সর্গ ‘প্রেতপুরী’

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের অষ্টম সর্গের নাম ‘প্রেতপুরী’। সপ্তম সর্গ শেষ হয়েছিল লঙ্কেশ্বর রাবণের হাতে লক্ষ্মণের মৃত্যুতে। অষ্টম সর্গ শুরু হয়েছে সূর্যাস্তের পর, আঁধার যুদ্ধক্ষেত্রে। লক্ষ্মণের মৃতদেহ পড়ে আছে সেখানে। রামচন্দ্র তাঁর পাশে ভূমিতে লুটিয়ে বিলাপ করছেন, শােকাভিঘাতে মূচ্ছা যাচ্ছেন কখনাে। বিভীষণ, হনুমান, নল, নীল, সুগ্রীব, অঙ্গদ, শরভ, সুমালী প্রভৃতি বীরেরা শােকম-দশায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যুদ্ধভূমিতে আলাের জন্য জ্বালানাে হয়েছে ধুনি।

বিলাপে বিহুল রামচন্দ্রের মনে পড়ছে লক্ষ্মণের ভাতৃপ্রেম, ভ্রাতৃবধু সীতার প্রতি তার ভক্তি, সদা আজ্ঞাবহতা, ত্যাগ এবং অন্যান্য গুণপনার কথা। মাতা সুমিত্রাকে কি বলবেন তাই ভেবেও রাম আকুল। উদভ্রান্ত চিত্তে কখনাে দয়াময়ী রাত্রিকে, কখনাে আকাশের চাঁদকে প্রার্থনা করেছেন তিনি লক্ষণকে পুনর্জীবিত করে দেওয়ার জন্য। তাঁর এ করুণ দশা দেখে। কৈলাসে ব্যথিত হলেন শঙ্করী। তিনি জানেন রামের এ অবস্থার জন্য দায়ী মহাদেব, তাঁরই। তেজে রাবণ লক্ষ্মণকে হত্যা করেছে। শঙ্করী তাই মহাদেবের প্রতি অভিমান করলেন সখেদে।। তখন পত্নীকে খুশি করার জন্য মহাদেব বললেন আম্মা বলে দেবে কি করে বাঁচানাে যাবে তাকে; মায়ার সঙ্গে রাম যান প্রেতলােকে। মহাদেব বললেন, তাঁর আর্শীবাদে সশরীরেই রাম প্রেতলােকে যেতে পারবেন; মায়া নিয়ে যান তাঁর শূল, তারই কল্যাণে তাদের কোথাও কোনাে সমস্যা হবে না।

লক্ষ্মণ বেঁচে উঠবে, প্রেতলােকে দশরথের। দুগা মায়াকে স্মরণ করে তাঁর করণীয় সম্পকে নির্দেশ দিলে মায়াদেবী অবিলম্বে এসে সেই শুভসংবাদ দিলেন রামকে। সুগ্রীবাদি বীরদেরকে লক্ষ্মণের দেহরক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে, সিন্ধুতীর্থে স্নান করে অগ্রগামিনী মায়াদেবীর সঙ্গে অবিলম্বে রাম যাত্রা করলেন প্রেতলােকের উদ্দেশ্যে।

কিছুক্ষণ পরেই তিনি পৌঁছালেন বৈতরণী তীরে, তারই পরপারে সূর্যহীন, চন্দ্র-তারা-হীন, চির-আঁধার প্রেতলােক। সেখানে মেঘে ঢাকা আকাশ, ঝড় বইছে, মেঘের সংঘর্ষে উদগীর্ণ হচ্ছে আগুন। বৈতরণীর উপরে অদ্ভুত সেতু, তাতে কখনাে আগুন জ্বলছে, কখনাে ধোঁয়ায় ঢেকে যাচ্ছে, কখনাে আবার তা পরিণত হচ্ছে সােনার সেতুতে। রামের প্রশ্নের উত্তরে মায়া জানালেন পাপীরা আসলে এ সেতু আগুনে বা ধোঁয়ায় ভরে যায়, পুণ্যবানেরা আসলে হয়ে যায় সােনার। মর্তে মরদেহ ত্যাগ করে কর্মফল ভােগ করার জন্য আত্মারা এখানে আসে। পাপী আত্মাদের নদী সাঁতরে কষ্টে আসতে হয়, নদীর জল গরম তেলের মতাে, উপরন্তু যমদূতেরা পীড়ন করে তাদের।

সেতুর মুখে দণ্ডধারী ভয়ঙ্কর এক যমদূত পথরােধ করে দাঁড়াল রাম ও মায়াদেবীর। মায়াদেবী তখন শিবের দেওয়া ত্রিশূল দেখালেন। সঙ্গে সঙ্গে বিনত হয়ে সে প্রণাম করল মায়াকে। সােনার সেতু বেয়ে প্রেতলােকে পৌছে রাম একটা বিশাল লােহার পুরী দেখতে পেলেন, দেখলেন তার প্রবেশদ্বারে ভয়ঙ্কর আগুনের চাকা ঘুরছে; তােরণে লেখা আছে এ পথ দিয়ে পাপীরা যায়, নিষ্কাম হয়ে এখানে প্রবেশ করতে হবে।

সেই পুরীর দুয়ারে রাম পিত্ত, শ্লেষ্ম, বায়ু রােগ ও জুরকে দেখলেন; উদারপরতাকে বমি করতে এবং সেই বমি দুই হাতে তুলে খেতে দেখলেন; উন্মত্ততাকে হাসতে, নাচতে, ঝগড়া করতে দেখলেন; তার পাশে গলিত দেহ হয়েও কামকে মত্ত দেখলেন কামক্রীড়ায়। দেখলেন যক্ষ্মা, হাঁপানি প্রভৃতি আরাে ভয়ঙ্কর ব্যাধিদের দেখলেন রক্তমাখা শরীর যুদ্ধকে, ক্রোধ যার রথের সারথি। হত্যা, আত্মহত্যাকেও দেখলেন তিনি। মায়াদেবী বললেন এরা সবাই যমদূত, নানা মূর্তিতে পৃথিবীতে ঘােরে।

দক্ষিণ দুয়ার দিয়ে প্রেতলােকে প্রবেশ করে রাম দেখলেন এক বিশাল মহাদ; কোটি কোটি পাপী আত্মা তার কালাগ্নি জলে দগ্ধ হয়ে আর্তনাদ করছে, দৈববানী তাদের বিবেককে সতর্ক করছে আর যমদূত করছে প্রহার। রাম এদের জন্য করুণাবােধ করেন, তাই মায়া যখন তাকে কুম্ভীপাক নরক বা আত্মঘাতীদের শাস্তি দেখাতে নিয়ে যেতে চান তখন তিনি অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। মায়া তাকে নিয়ে আসেন এক বনে; সেখানে সশরীরী রামকে ঘিরে ধরে আত্মারা, মানবকণ্ঠের স্বর শুনতে চায় তারা। এখানেই দেখা যায় মারীচের আত্মাকে। রাবণের কু-স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে রামকে প্রবঞ্চনা করার পাপে তাকে এখানে আসতে হয়েছে। সূর্পনখার সহচর দূষণ ও খরের ক্রুদ্ধ আত্মাকেও দেখা গেল এখানে। মায়া বললেন, এ বনের নাম বিলাপী। নানা কুণ্ডে বসবাসকারী আত্মারা মাঝে মাঝে বিলাপ করতে এই বনে আসে।

সেখান থেকে আরাে কিছুদূর এগিয়ে রাম দেখলেন পৃথিবীতে যারা সৌন্দর্যচর্চায় ও দেহসুখে মত্ত ছিল সেইসব নারীরা আক্ষেপ ও আত্মধিক্কার দিতে দিতে যাচ্ছে। তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কন্দাকার যমদূতীরা। তারপর তিনি দেখলেন একদিক থেকে পরমাসুন্দরী প্রণয় কৌতুহলী নারীরা এল, অন্যদিক থেকে এল সুন্দর নাগর পুরুষেরা, পারস্পরিক আকর্ষণের চূড়ান্ত মুহূর্তে দৃশ্য পাল্টে গেল, মিলনের বদলে নিজেদের মধ্যে তারা কামড়া – কামড়ি, মারামারি করতে লাগল মাটিতে পড়ে। মায়া বললেন, পৃথিবীতে এরা ধর্ম বিসর্জন দিয়ে কামক্রীড়ায় মত্ত ছিল, এখানে তার শাস্তি পাচ্ছে এভাবে।

রামের কিন্তু এসব বিষয়ে আগ্রহ ছিল না। এত কিছু দেখানাের জন্য মায়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি দশরথের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলেন, লক্ষ্মণের প্রাণ বাঁচানাের কৌশল জানার জন্যই তিনি অধীর।

বারাে বছর নিরন্তর ঘুরলেও এ প্রেতলােকে দেখা শেষ হবে না জানিয়ে মায়া রামকে নিয়ে গেলেন পূর্বদ্বারে, সাধ্বীরা সেখানে স্বামীদের সঙ্গে সুখে বাস করে। সুন্দর অট্টালিকা, সুন্দর বাগান, সুন্দর সরসী সেখানে, সুস্বাদু খাদ্য। সেখান থেকে অনেক শুকনাে পােড়া পাহাড়, শত শত মরুভূমি, বিষধর সাপে পূর্ণ অনেক নদী পার হয়ে গিয়ে রামচন্দ্র মধুর শব্দে পূর্ণ অঞ্চলে স্বর্ণসৌধ দেখতে পেলেন। দেখলেন সুন্দর বাগান, পদ্মপূর্ণ দীঘি। মায়া বললেন, এ হল স্বর্গের মতাে সুখসদন, পুণ্যবানেরা বাস করেন এখানে। রাম দেখলেন এখানে আয়ােজন রাজসিক। যুদ্ধের শৌখিন মহড়া চলছে, কবিরা গাইছেন বীরস্তোত্র, বিদ্যাধর কিন্নর-অঙ্সরারা সাজিয়েছে আনন্দের পসরা। শুম্ভ, নিশুম্ভ, মহিষাসুর, বৃত্র, সুন্দ, উপসুন্দ প্রভৃতি বীরদের আনন্দমূর্তি দেখা গেল এখানে। মায়া বললেন অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া ছাড়া এখানে আসা যায় না, কুম্ভকর্ণ, ইন্দ্রজিং প্রভৃতির আগ্রা সেজন্যই এখানে এখনও আসেনি। রামকে বীরদের সঙ্গে কথা বলার সুযােগ দিয়ে অকস্মাৎ অন্তর্হিত হলেন মায়াদেবী।—তখন বালীর সঙ্গে দেখা হল রামের। অন্যায় যুদ্ধে তাকে হত্যা করার জন্য রাম লজ্জা পেলেও, এ রাজ্যে জিতেন্দ্রিয় বালি রামকে নিয়ে গেলেন জটায়ুর কাছে। জটায়ু রামের কাছে যুদ্ধের খবর নিলেন, এবং তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন দশরথের কাছে। পশ্চিম-দুয়ারে তিনি রামকে দেখালেন তার পূর্বজ দিলীপ ও তার মহিষী সুদক্ষিণাকে, দেখালেন ইক্ষাকু, মান্ধাতা, নহুষ প্রভৃতি পূর্বসূরীদের। দিলীপ এবং সুদক্ষিণা রামের পরিচয় পেয়ে তাকে আশীর্বাদ করলেন, জানালেন রামের জন্য তাদের বংশ উজ্জ্বল হয়েছে। রামকে তারা বললেন অদূরে স্বর্ণগিরি পাহাড়ের পাশে বৈতরণী-তীরে অক্ষয় বটের নিচে দশরথ তারই কল্যাণ কামনায় নিত্য পুজো করেন ধর্মরাজের। রাম জটায়ুদের বিদায় করে, দিলীপ-সুদক্ষিণার কাছে বিদায় নিয়ে, একাকী গেলেন পিতৃসমীপে।

দশরথ প্রাণপ্রিয় পুত্রকে দেখে আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য আক্ষেপ করতে লাগলেন। রাম জানালেন তার আগমন হেতু, যা আগেই জানা ছিল দশরথের। পুত্রকে তিনি বললেন, লক্ষ্মণ এখনাে মরেনি, গন্ধমাদন পর্বতশীর্ষে হেমলতা বিশল্যকরণীর সাহায্যে সে পুনরুজ্জীবিত হবে; যম তাকে এ সত্য জানিয়েছেন। দশরথ আরাে বললেন, সেই লতা রাত পােহানাের আগেই আনার জন্য রাম যেন হনুমানকে পাঠায়; বললেন, রাবণ তার শরে সবংশে নিহত হবে; সীতা ফিরে এসে আবার উজ্জ্বল করবেন রঘুকুল। তবে রামের ভাগ্যে সুখ নেই, যদিও বহু কষ্ট সহ্য করে আপন গুণে ভারতভূমিতে সে অখন্ড যশের অধিকারী হবে। বিদায়কালে রাম পিতার পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলে দশরথ বললেন—এ দেহ ছায়া মাত্র, এক ছোঁয়া যায় না। তখন পিতার উদ্দেশ্যে প্রণাম করে রাম দ্রুত লঙ্কার যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্মণের দেহ ঘিরে অপেক্ষারত শােকাকুল বীরবৃন্দের মধ্যে ফিরে এলেন।

এই হল ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের অষ্টম সর্গের কথাবস্তু। লক্ষণীয় এর আরম্ভ হয়েছে। আঁধার নামা যুদ্ধক্ষেত্রে, শেষও হয়েছে সেই পটভূমিতেই। কিন্তু এই পটভূমিটি দেখা যাচ্ছে অল্প কিছুক্ষণের জন্যই। মর্তের পর একবার কৈলাস বা স্বৰ্গকে দেখা গিয়েছে, তারপর কাহিনী প্রবেশ করেছে প্রেতলােকে। প্রেতলােকের পটভূমিতেই এ সর্গের প্রধান বিস্তার। লক্ষ্মণকে পুনরুজ্জীবিত করে তােলার কৌশল জানতে শিবের পরামর্শানুযায়ী রাম মায়ার সঙ্গে প্রেতপুরীতে প্রবেশ করেছেন। প্রেতপুরী তাঁর অজানা দেশ; সুতরাং বিস্মিত দৃষ্টিতে তিনি এখানকার পরিবেশ, শাস্তি বা শান্তি-ব্যবস্থা, যমদূতেদের নির্দয় আচরণ, পুণ্যফলের সৌম্যতা, ব্যথিত মানবাত্মার করুণ আর্তি ইত্যাদি লক্ষ্য করেছেন এবং তারই বর্ণনায় পরিসর বৃদ্ধি হয়েছে এ সর্গের। রামায়ণে রামের প্রেতলােক যাত্রার কথা নেই, লক্ষ্মণকে বাঁচিয়ে তােলার জন্য বিশল্যকরণী আনার কথা সেখানে বলেছিলেন সুগ্রীবের শ্বশুর কপিবৈদ্য সুষেণ। মধুসূদন সুষেণ প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে রামকে প্রেতেলােকে দশরথের কাছে নিয়ে গেছেন। মূলত এই প্রেতলােক বর্ণনার আগ্রহেই। —মহাভারতে যুধিষ্ঠির ক্ষণেকের জন্য নরক দর্শন করেছিলেন। ওডিসি-তেও নরক বর্ণনা আছে। বাড়ি ফিরতে ওডিসি র অত্যন্ত দেরী হওয়ায় তার ছেলে নানা স্থানে সন্ধান করার পরে নরকে গিয়েছিলেন পিতার আত্মার সন্ধানে। বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রেত-আত্মার সঙ্গে মিলিত হতে যাওয়ার কল্পনা-সূত্রটি মধুসূদন প্রাথমিক ভাবে হােমারের ওডিসি থেকেই পেয়েছেন। কিন্তু নরকের বর্ণনায় হােমারে কোনাে চমৎকারিত্ব না থাকায় সে ক্ষেত্রে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন দান্তের “ডিভাইন কমেডি’র ইনফার্নো। কাঁনাতে; তবে এ বিষয়ে তাকে আরাে কিছুটা সাহায্য করেছে মিল্টনের ক্যাওস’।

নরক বর্ণনা পাশ্চাত্ত্য-সাহিত্যে প্রাজ্ঞ কবির যেন একটি পুরনাে শখ; রামের প্রেতলােক যাত্রার একটা হেতু প্রতিষ্ঠিত করে তিনি সে শখ পূরণ করেছেন। তাতে একাব্যের লাভালাত যা হয়েছে সে পর্যালােচনায় যাওয়ার আগেই এটা স্বীকার করতে আপত্তি থাকতে পারে না। যে, প্রেতলােক উপস্থাপনার আগ্রহই অষ্টম সর্গ রচনায় কবির প্রধান আগ্রহ, আর এই প্রধান আগ্রহের ফল হিসাবে এ সর্গের বিষয় ও পটভূমি হয়েছে প্রেতলোেক এবং সে জন্য এ সর্গের ‘প্রেতপুরী’ নামকরণ সন্দেহতীত ভাবেই শিল্পসার্থক।

প্রশ্ন উঠেছে, ‘মেঘনাদ বধ কাব্যে এ সর্গের সংযােজনা শিল্পসিদ্ধ কিনা। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে শিল্পের দিক থেকে অষ্টম সর্গের সংযােজনা অনিবার্য ছিল না। যাকে বাঁচিয়ে তােলার জন্য এ সর্গের আয়ােজন অথবা যিনি সেই আয়ােজনের পুরােগামী তারা কেউই এ কাব্যের নায়ক নন। যিনি নায়ক, তিনি মারা গেছেন ষষ্ঠ সর্গে; তার মৃত্যুর ফলশ্রুতি সপ্তম ও নবম সর্গে; সততই অষ্টম সর্গ কাহিনী ধারায় শিথিল অন্বয়।

কিন্তু মনে রাখতে হবে কাব্যটি মহাকাব্য। মহাকাব্যে এমন অনেক ঘটনা বা প্রসঙ্গ থাকে যারা মূলকাহিনীর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অন্বিত নয়, কিন্তু মহাকাব্যের ব্যাপ্তির মধ্যে তারা মানিয়ে যায়। প্রেতপুরী’ও তেমনি মানিয়ে গেছে ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যে।

শুধু মানিয়েই যায় নি, এতে কাব্যটির সমৃদ্ধিও ঘটেছে নানা দিক থেকে। প্রথমতঃ এ সর্গকে বাদ দিলে ‘মেঘনাদবধ’ হত আট সর্গের এবং সেক্ষেত্রে তাকে মহাকাব্যের সম্মান দেওয়া যেত না। বিশ্বনাথ মহাকাব্যে অষ্টাধিক সর্গ সংযােজনার নির্দেশ দিয়েছেন। দ্বিতীয়তঃ স্বর্গ-মত-পাতাল-অন্তরীক্ষ নরক ইত্যাদির বর্ণনা মহাকাব্যের ব্যাপ্তির পক্ষে আবশ্যিক, অষ্টম সর্গ ব্যতিরেকে সে আবশ্যিকতা ক্ষুন্ন হত। তৃতীয়তঃ জীবন, মৃত্যু এবং মৃত্যুত্তীর্ণ জীবনের মধ্য দিয়ে প্রাণের যে বিশাল প্রবাহ, মহাকাব্যের ব্যাপ্তির সঙ্গে তাল রেখে তাকে উপস্থাপিত করা গেছে এই সর্গের কৌলীন্যেই। চতুর্থতঃ ‘মেঘনাদবধ কাব্যের মূলকাহিনী মাত্র আড়াই দিনের। তাতে ঘটনা-ব্যাপ্তির ব্যঞ্জনা এনেছে চতুর্থ সর্গে সীতার স্মৃতিচারণা ও স্বপ্ন কথা এবং এই অষ্টম সর্গে দশরথের অনুতাপ-ক্ষিঃ অতীত স্মৃতি ও রামের ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কিত আভাসােক্তি। অতএব মহাকাব্যোচিত কালপরিধিতে ব্যাপ্ত হওয়ার জন্য এ কাব্যের পক্ষে এ সর্গের ভূমিকা অশােকবনের মতােই গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চমতঃ রসবৈচিত্র্য এসেছে অষ্টম সর্গের কৌলীন্যে। প্রথম সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনায় বীভৎস রসের সামান্য বর্ণনা ছিল, এ সর্গে তা প্রমূর্ত হয়েছে। তার সঙ্গে বিস্ময় রসের, এবং বালী, জটায়ু, দিলীপ ইত্যাদি প্রসঙ্গে শান্ত রসের আলিম্পনাও রচিত হয়েছে। স্বতন্ত্র পরিবেশ ও রসাবেদনে স্বর্গ-মত্যের ষড়যন্ত্র এবং যুদ্ধমুখর ঘটনাধারার মাঝে এ সর্গ পাঠককে এনে দিয়েছে নাটকীয় বিশ্রাম (Dramatic relief), যা তার রসতৃষ্ণাকে নবীভূত করে সংবাহিত করে দিয়েছে কাব্যের পরিণতির দিকে।

অতএব, উপসংহারে একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, অষ্টম সর্গ ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যে ঈষৎ শিথিল গ্রন্থি হলেও তা অপরিহার্য; তাকে বাদ দিলে মহাকাব্য হিসাবে এ গল্পের শুধু অঙ্গহানিই হয় না, হানি ঘটে বন্ধ শিল্প-মাত্রারও।

মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য – কৃষ্ণগোপাল রায়

আরো পড়তে পারেন

Spread the love

9 thoughts on “মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু অষ্টম সর্গ ‘প্রেতপুরী’”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ 'অভিষেক'

  2. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু চতুর্থ সর্গ 'অশোকবন'

  3. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ সর্গ 'বধ'

  4. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র - Debota Hembram

  5. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু নবম সর্গ ‘সংস্ক্রিয়া’ - Debota Hembram

  6. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু পঞ্চম সর্গ ‘উদ্যোগ’ - Debota Hembram

  7. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ ‘অস্ত্রলাভ’ - Debota Hembram

  8. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ ‘সমাগম’ » Debota Hembram

  9. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’ » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *