Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.

মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ ‘সমাগম’

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের তৃতীয় সর্গের নাম কবি দিয়েছেন ‘সমাগম’

প্রথম সর্গে আমরা দেখেছিলাম ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী প্রমােদকাননে মেঘনাদকে বীরবাহুর মৃত্যু সংবাদ এবং পিতার যুদ্ধ-যাত্রার প্রস্তুতির সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিলেন। সেই সংবাদে উদ্বিগ্ন ও ক্রুদ্ধ মেঘনাদ পত্নী প্রমীলার কাছে ত্বরায় আমি আসির ফিরিয়া’ বলে বিদায় নিয়ে গিয়েছিলেন লঙ্কায়। সেখানে পিতৃ-আদেশে যুদ্ধযাত্রার পূর্বে ইষ্টদেবতার আরাধনায় ব্যাপৃত হন তিনি। এদিকে অনুমিত সময় উত্তীর্ণ হবার পর পাতিপ্ৰাণা প্রমীলা উতলা হয়ে ওঠেন বিরহ-যন্ত্রণায়। তার সে বিরহ বেদনার কথা দিয়েই ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের তৃতীয় সর্গের কথারম্ভ।

বিরহিনী রাধার মতাে ফুলবনে ঘুরে-ঘুরে, কখনাে উঁচু গৃহের ছাদে চেপে দূর লঙ্কার পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন প্রমীলা; বিরহ যন্ত্রণায় তার চোখ দিয়ে অবিরল গড়ায় অশ্রুধারা। পতি-ব্যতীত রাত্রিযাপন সর্পদংশনের মতাে ভয়ঙ্কর। সখী বাসন্তী তাঁকে প্রবােধ দেয়; ফুল তুলে মালা গাঁথতে বলে; প্রিয় এলে সে মালা তার গলায় পরিয়ে দেওয়া যাবে।

ফুলবনে ফুল তুলতে গিয়ে সূর্য-বিরহে সূর্যমুখীকে ম্লান দেখে তার সঙ্গে নিজের তুলনা করেন প্রমীলা। কিন্তু সূর্য তাে সকালে নির্দিষ্ট সময়ে উঠবে আবার, শেষ হবে সূর্যমুখীর যন্ত্রণা; প্রমীলার প্রিয় প্রমীলার কাছে আবার ফিরে আসবেন তো? – কেন এ চিন্তা এল প্রমীলার মনে? কার যুদ্ধ চলছে লঙ্কায়, কোনাে বীর সেখান থেকে ফিরে আসছে না। মেঘনাদের ফিরে না-আসার ভয় সচেতন ভাবে প্রমীলার মনে নেই, এ যেন তার অবচেতনার অমঙ্গলাশঙ্কা, যেন পতিগতপ্রাণা রমনীর মনে পতির অমঙ্গলের পূর্ব ছায়াপাত। পাশ্চাত্য এ কাব্য-কৌশলটি বাংলা সাহিত্যে মধুসূদনের আনা।

যাই হােক, ফুল তােলা, মালা গাঁথার পরেও মেঘনাদকে ফিরে আসতে না দেখে প্রমীলা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি নিজেই যাবেন লঙ্কায় পতি-সন্নিধানে। তাকে সংযত করতে চেয়ে সখী বাসন্তী বলে রামচন্দ্রের সৈন্যরা লঙ্কায় যাওয়ার পথ অবরােধ করে রেখেছে, সেখানে যাওয়া অসম্ভব। একথা শুনেই প্রমীলা গর্জে ওঠেন—পর্বত থেকে বেরিয়ে নদী যখন সমুদ্রের দিকে ছােটে তখন কেউ কি আটকাতে পারে তাকে?দাবন-কন্যা তিনি রক্ষাকুলবধূ, রাবণ তাঁর শ্বশুর, মেঘনাদ স্বামী, তিনি কি ভিখারী রামচন্দ্রকে ভয় পান? বাহুবলে তিনি লঙ্কায় প্রবেশ করবেন। নৃমুণ্ডমালিনীকে তিনি আদেশ দেন লঙ্কা অভিযান-প্রস্তুতির। মুহূর্তে একশাে দানবী শাণিত অস্ত্রে সজ্জিতা ও অশ্বারূঢ়া হয়ে যায়। লজ্জা-ভয় ত্যাগ করে প্রমীলাও সজ্জিতা হন বীরাঙ্গনাবেশে। তার কোমরে ঝােলে কোযবদ্ধ তরবারি, হাতে দীর্ঘশূল। অভিযানের প্রাকনুহর্তে নারীবাহিনীর উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দেন; তার স্বামী মেঘনাদ লঙ্কাপুরিতে বন্দীর মত, অথবা কি কারণে তার দেরী হচ্ছে তা দেখতে তিনি পতিপাশে যেতে চান। রামচন্দ্র লঙ্কা অবরােধ করে রেখেছে। তাঁর অবরােধ ভাঙতে হবে। দানবকুলের বিধি শত্রুর হাতে মরা অথবা শত্রুকে নিধন করা।

প্রমীলার উত্তেজক ভাষণে উত্তেজিত নারী-বাহিনী লঙ্কা কঁপিয়ে, পথের ধুলাে আকাশে উড়িয়ে ছুটে চলে এবং অচিরাতে রাজধানীর পশ্চিম দুয়ারে গিয়ে পৌঁছায়। তাদের সম্মিলিত শঙ্খধ্বনি আর কোদণ্ড টঙ্কার শুনে আস্ফালন করে আসেন হনুমান। কিন্তু তাকে বর্বর’, ‘ক্ষুদ্রজীবী’, ‘অবােধ’, ‘বনবাসী’ ইত্যাদি বলে ভৎসনা করে নৃমুণ্ডমালিনী রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ আর রক্ষোকুলকলঙ্ক বিভীষণকে ডাকতে বলে, সে জানিয়ে দেয় তাদের আগমন উদ্দেশ্যও।

প্রমীলাও জানান তার স্বামী নিজেই ভুবন-বিজয়ী, সুতরাং তার স্বামীর শত্রুর সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করতে চান না, যা তিনি চান তা জানানাের জন্য রামচন্দ্রের কাছে তিনি দূতী নৃমুণ্ডমালিনীকে পাঠিয়ে দেন।

বিভীষণ রামের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন শিবির-বাইরে বীরাঙ্গনাদের দিকে। কিয়ংক্ষণের মধ্যেই হনুমানের সঙ্গে নূমুণ্ডমালিনী এসে হাজির হয়। রামচন্দ্র ও অন্যান্য গুরুজনদের শিষ্ট অভিবাদন শেষে মুণ্ডমালিনী জানায় প্রমীলার আগমন হেতু, বলে ‘আসি যুদ্ধ কর তার সাথে; নতুবা ছাড়হ পথ’। রামচন্দ্র জানান-অকারণে তিনি যুদ্ধ করেন না; তার শত্ৰু রাবণ, রক্ষোকুল-কন্যা বা বধুরা নন; সুতরাং নিঃশঙ্কায় তারা লঙ্কায় প্রবেশ করতে পারেন। রাক্ষসকুলবধূর পতিভক্তির প্রশংসা করেন তিনি, আশীর্বাদ করেন দূতীকে এবং হনুমানকে আদেশ দেন এঁদের পথ ছেড়ে দিতে।

রামচন্দ্রকে প্রণাম করে দূতী বেরিয়ে যাওয়ার পর বিভীষণ বন্ধুকে শিবিরের বাইরে এসে প্রমীলার পরাক্রম দেখতে বলেন। রামচন্দ্র বলেন, দূতীকে দেখেই তিনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, যুদ্ধের সাধ ত্যাগ করেছিলেন তখনি।

এদিকে অবরােধ শিথিল হওয়ায় প্রমীলার নারী-বাহিনী সােল্লাসে লঙ্কায় প্রবেশ করে। তেজস্বিনী প্রমীলার বীর্যবত্তায় অভিভূত হয়ে রামচন্দ্র বিভীষণকে জিজ্ঞাসা করেন, প্রমীলার ছদ্মবেশে মায়াদেবী স্বয়ং লঙ্কায় প্রবেশ করলেন না তাে? বিভীষণ জানান, এ রাক্ষসবই; কালনেমি দৈত্যের কন্যা, দুর্গার অংশে এর জন্ম।

মেঘনাদের সঙ্গে প্রমীলা এসে মেলায় যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রামচন্দ্র। কিন্তু লক্ষ্মণ বলেন, অধর্ম কোথাও কখনো জয়ী হয় না, জনকের পাপেই মারা যাবে মেঘনাদ, দেবতাদের কৃপায় তারই হাতে কাল তার মৃত্যু। বিভীষণের লক্ষ্মণের কথা মেনে নিয়েও সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন, কারণ রাত্রেই প্রমীলা তার দলবল নিয়ে আক্রমণ করতে গারেন। আতঙ্কিত রামচন্দ্র লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে বিভীষণকে সর্তক প্রহরায় দেখাশােনা করতে বলেন।

লঙ্কার অন্তঃপুরে বধু-বেশে সজ্জিত হয়ে প্রমীলা হষ্টচিত্তে স্ত্রীর সঙ্গে গিয়ে স্বাসনে বসেন নৃত্যগীতাদি উপভােগ করতে। লয় বাইরে তখন বিভীষণের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সতর্ক ধীরবুহ পরিদর্শন করেন লক্ষ্মণ।

কৈলাসে পার্বতী সখী বিজয়াকে ডেকে দেখান গ্রমীলার লঙ্কাভিযান। রামের জয় সম্পর্কে ভীত বিজয়াকে তিনি জানান যে তাঁর অংশেই প্রমীলার তেজ, কাল তিনি সে তেজ হরণ করবেন; লক্ষ্মণ অবশ্যই মারবেন মেঘনাদকে; স্বামীর সঙ্গে শিবলোকে আসবেন প্রমীলা; মেঘনাদ শিবসেবা করবেন, প্রমীলা হবেন তাঁদের সখী। -এই হল ‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের তৃতীয় সর্গের কথাবন্তু।

Spread the love

9 thoughts on “মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ ‘সমাগম’”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ 'অস্ত্রলাভ'

  2. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু চতুর্থ সর্গ 'অশোকবন'

  3. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র - Debota Hembram

  4. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু অষ্টম সর্গ ‘প্রেতপুরী’ - Debota Hembram

  5. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু নবম সর্গ ‘সংস্ক্রিয়া’ - Debota Hembram

  6. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ ‘অস্ত্রলাভ’ - Debota Hembram

  7. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু সপ্তম সর্গ ‘শক্তিনির্ভেদ’ – Debota Hembram

  8. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ সর্গ ‘বধ’ – Debota Hembram

  9. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’ » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *