মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র

মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্রটি এখানে আলোচনা করা হয়েছে।

 

`মেঘনাদবধ’ কাব্যের সর্বাধিক আলােচিত চরিত্র রাবণ। তাকে নিয়ে এত আলােচনা সমালােচনার কারণ চরিত্রটিকে মধুসূদন দেখেছেন বাল্মীকিস্কৃত্তিবাসের তুলনায় সম্পূর্ণ নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। যুগের দ্রোহবুদ্ধি এক্ষেত্রে ক্রিয়াশীল তার ভিতরে। বন্ধু রাজনারায়ণকে (মে। ১৫, ১৮৬০) একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন, …as a jolly christian youth, I don’t care a pin’s head for Hinduism.’ জলি ক্রিস্টান’ কথাটি তিনি লিখেছিলেন সম্ভবত চিঠিটি রাজনারায়ণকে লেখা বলে (তিনিও ক্রিস্টান), আসলে ক্রিস্টান না হলেও মধুসূদনের হাতে রাবণ বাল্মীকি বা কৃত্তিবাসের অনুরূপ হতে পারত না। কারণ, তার বিদ্রোহ আদৌ কোনাে ধর্মীয় সংস্কারের নয়, মন ও মেধার, যুগতাড়িত যুক্তির।

রাবণের সীতাহরণকে বাল্মীকি বা কৃত্তিবাস দেখেছিলেন তার অক্ষম্য অপরাধ হিসাবে, কিন্তু মধুসূদন দেখেছিলেন ভগ্নী সূর্পনখার অপমানের প্রতিশােধ হিসাবে। সেজন্য রাবণ মেঘনাদবধ কাব্যে বারবার তার সকরুণ পরিনতির কারণ খুঁজতে গিয়ে বিধিকেই দায়ী করেছে, কখনাে বা দায়ী করেছে। সূর্পনখাকে, কিন্তু কখনােই নিজেকে দায়ী করেনি।



কিন্তু রাবণ যে নানা দুষ্কর্মের নায়ক তা মধুসূদনের অজানা ছিল না। চতুর্থ সর্গে তারই জটায়ু রাবণের পথ অবরােধ করে বলেছে, ‘চোর তুই, লঙ্কার রাবণ।/ কোন কুলবধু আজি হারিলি দুর্ম্মতি?…/…এই তোর নিত্য কর্ম্ম, জানি।’ রামায়ণ জানাচ্ছে, পরস্ত্রী বা নারীহরণ এবং বলাৎকারে রাবণের ইতিহাস দীর্ঘ। জটায়ুর ঐ উক্তিতে তারই আভাস। যে চিত্রঙ্গদাকে মধুসূদন অত্যন্ত দরদ দিয়ে চিত্রিত করেছেন, রাবণ তাকেও এনেছিল অপহরণ করে।

এ তথ্য মধুসূদনের জানা ছিল নিশ্চয়ই যে রাবণের কামতপ্ত বলাৎকার চেষ্টায় উত্যক্ত ও ক্রুদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু বিধানেই মহর্ষি কুশধ্বজের কন্যা বেদবতী জুলন্ত চিতায় আত্মত্যাগ করেন ও ত্রেতাযুগে সীতা রূপে বসুমতির গর্ভে জন্ম নেন; কিম্বা, নলকুবেরের উদ্দেশ্যে অভিসাররত অপ্সরা রম্ভাকে পথ আটকে রাবণ জোর করে ধর্ষণ করে এবং তাতে ক্রুদ্ধ হয়েই নলকুবের রাবণকে অভিশাপ দেয় যে নারীর সম্মতি বিনা ধর্ষণ করলে তার মত্য হবে, আর এই অভিশাপের ভয়েই অশােকবনে সীতার উপর রাবণ যে কোনাে জুলুম করতে পারে নি, এ সব তথ্যও মধুসূদনের অজানা ছিল না।



কিন্তু তবু তার কেন মনে হল যে ‘He was a grand fellow?’ অথবা, -The idea of Ravana kindles and elevates my imagination’ যে বলেছেন তিনি, রাবণের মধ্যে কি আইডিয়া’ তিনি পেলেন যা তাঁর কল্পনাকে উদবেজিত করে তুলল?

এসব প্রশ্নের উত্তর মধুসূদন দিয়ে যান নি। সেই জন্য সমালােচকেরা উত্তরটাকে অনুমানে ধরার চেষ্টা করেছেন নিজেদের মতাে করে। প্রমুখ সমালােচকদের অনেকেই বলতে চেয়েছেন রাবণের বিধি-বিড়ম্বিত জীবনের মধ্যে মধুসূদন নিজের বিধি-বিড়ম্বিত জীবনের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু এ-ভাবনার মধ্যে সারবত্তা আছে বলে মনে হয় না। প্রথমতঃ এতে রাবণ চরিত্রের অবজেকটিভ ধর্মকে অনেকটা অস্বীকার করা হয়; দ্বিতীয় যে সময়ে মাইকেল ‘মেঘনাদবধ’ লিখছেন (১৮৬০) তখনও নিজের জীবনকে বিধি বিড়ম্বিত’ বলে ভাবার যথেষ্ট কারণ ছিল না।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

এ সময় তার মা-বাবা মারা গিয়েছেন ঠিকই, মাদ্রাজের কঠোর জীবন সংগ্রাম এবং রেবেকার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির (এর কারণ মধুসূদনের সাম্প্রতিক এবং সবচেয়ে যুক্তিনিষ্ঠ জীবনী-লেখক গােলাম মুর্শিদও আবিস্কার করতে পারেননি, আগের জীবনীকাররা গালগল্প বানিয়েছেন) অভিঘাত যে তাকে তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে গেছে। তা-ও অস্বীকার করা যাবে না, তবু মনে রাখতে হবে এ তাঁর রাবণের মতাে স্বপ্নভঙ্গের কাল নয়। পিতার সম্পত্তি তিনি তখন ফিরে পেতে চলেছেন, পেয়েছেন বিশ্বস্তা হেনরিয়েটাকে, শর্মিষ্ঠা-পদ্মাবতী-তিলােত্তমা তাঁকে পৌছে দিয়েছে খ্যাতির শীর্ষে, মনে তার সাগরপারে ব্যারিষ্টারি পড়তে যাওয়ার—মিল্টন-শেক্সপীয়ারের দেশভ্রমণের পুরনাে স্বপ্ন নতুন করে দানা বাঁধছে।

 



বস্তুত এটাই তার জীবনের আশা-নবােদ্যম-খ্যাতি-সৃষ্টি-প্রেম ও স্বপ্নের স্বর্ণযুগ। লক্ষনীয় এ সময়ে লেখা তার কোনাে চিঠিতে হতাশার বাস্পমাত্রও নাই। তাই এ যুগে সৃষ্টি কোনাে চরিত্রের মধ্যে তার বিধি-বিড়ম্বনা জনিত হাহাকার প্রতিফলিত হয়েছে—এটা নিছকই কল্পনা।

তাহলে রাবণ তাঁর প্রিয়তম কোণ গুণে? এ উত্তর খোঁজা সঙ্গত হতে পারে তার রাবণ চরিত্রেই।

তাঁর রাবণ বিশাল ঐশ্বর্যশালী রাজা। তাঁর রাজ্য স্বর্ণলঙ্কা—স্বর্ণ এবং অতীব মূল্যবান রত্নসামগ্রীতে পরিপূর্ণ। নগরীর পথ-ঘাট-বিপণিতে অজস্র স্বর্ণকারু, নরনারীদের পরিধান ও সজ্জায় স্বর্ণাভরণ, রথ সােনার এখানে, সিংহাসন সােনার, মুকুট সােনার, রাজসভার ছাদ। সােনার, ঝলরেও সােনা বসানাে, স্তম্ভস্ফটিকে খচিত হীরা-পদ্মারাগাদি বহুমূল্য রত্ন। ঐশ্বর্যের শেষ নেই। সুন্দর সুসজ্জিত পুরী ভূতলে অতুল’, ‘জগত বাসনা’সে। তার রাজসভা, হস্তিনাপুর রাজসভার চেয়ে মনােহর। শুধু ধনপ্রসূ নয়, লঙ্কা বীরপ্রসূও। বীরবাহু, মেঘনাদ, কুম্ভকর্ণ, চামর, উদ, অসিলােমা, বাস্কল, বিড়ালাক্ষ ইত্যাদি অসংখ্য বীররথী এবং সুবিশাল বীরসৈন্যবাহিনী লঙ্কার গর্ভজাত। এখানকার মেয়েরাও বীরাঙ্গানা- যাদের তেজ দেখা গেছে তৃতীয় সর্গে প্রমীলার লঙ্কাভিযানের সময়। এমন ধন ও বলের যে অধীশ্বর মহিমা তার সতত সম্ভ্রমজনক।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র

রাজা হিসাবে রাবণ সুশাসক। তার সুশাসনের বর্ণনা সরাসরি কব্যে নেই, কিন্তু সারা রাজ্যের শৃঙ্খলা, শ্রী, সমস্ত অধিবাসীদের একমতিত্ব, রাজা ও যুবরাজের প্রতি তাদের অগাধ সম্রম ও আনুগত্য থেকেই রাজার সুশাসন পরােক্ষে আভাসিত। মন্ত্রিরাও রাজার দুঃখে সমব্যথী, কোথাও কোনাে গুঢ় ষড়যন্ত্রের আভাসমাত্র নেই। বিরুদ্ধাচারণ যে করেছিল তাকে। বিতাড়ন করা হয়েছে এবং সে-বিভীষণের জন্য কারাে কোনাে অনুকম্পা নেই। এই খানে মনে হয়, স্বাধীন বাগাধিকার হয়তাে নেই লঙ্কায়, কিন্তু মন্ত্রী সারণকে দেখা গেছে নির্ভয়ে স্বাধীন মত প্রকাশ করতে। কিন্তু সারণও বিভীষণের পক্ষ নিয়ে কোনাে কথা বলেনি। তাহলে ধরে নিতে হয় বিভীষণকে তারাও রাজারই মতাে ক্ষমা করতে পারেনি, যেমন পারেনি মন্দোদরী বা মেঘনাদ। -রাজ্যজোরা সুসংহতি রাজার গৌরব।

 



রাবণ নিজেও বীর। তার বীরত্বের বিদুৎ ঝলক একবার দেখা গেছে প্রথম সর্গের সেই মন্দ্রিত আহ্বানে সাজ হে বীরেন্দ্ৰবৃন্দ, লঙ্কার ভূষণ!/ দেখিব কি গুণ ধরে রঘুকুলমণি!/অ রাবণ অ-রাম বা হবে ভব আজি!” কিন্তু মেঘনাদের যুদ্ধগমনে তার বীরত্বের প্রকৃত চেহারা তখন প্রত্যক্ষ হয় নি, হয়েছে সপ্তম সর্গে। বস্তুত সপ্তম সর্গ না থাকলে মধুসূদনের রাবণ বীরত্বের এবং ব্যক্তিত্বের এতখানি উচ্চমহিমা লাভ করতে পারত না। ষষ্ঠ সর্গে মেঘনাদের মৃত্যু হয়েছে। এ সংবাদ রাবণ পেয়েছে সপ্তম সর্গে। সংবাদ পাওয়া মাত্রই হতচেতন হয়ে সে পড়ে গেছে সিংহাসন থেকে ভূমিতলে। কিন্তু জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পরই শােক তার জ্বলে উঠেছে লেলিহ প্রতিশােধ স্পৃহায়।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’

রামায়ণ জানিয়েছে এ দিন যুদ্ধে গিয়ে রাবণ মন্দোদরীর পিতার কাছ থেকে পাওয়া তপােতেজা শক্তিশেলে হত্যা করে লক্ষ্মণকে; মধুসূদন দেখিয়েছেন যে শৈব শক্তিতে দুর্বার রাবণকে এদিন যুদ্ধক্ষেত্রে গন্ধর্ব সৈন্য কিম্বা দেবসেনাপতি কার্তিক বা দেবরাজ ইন্দ্র, কিষ্কিন্ধ্যাপতি সুগ্রীব বা রামচন্দ্র কেউই প্রতিরােধ করতে পারেননি। রণক্ষেত্রে লক্ষ্মণকে খুঁজে বের করে তাকে সে হত্যা করেছে এবং হত্যা করেও তার ক্রোধ নির্বাপিত হয়নি, তার মৃতদেহ অধিকার ও লাঞ্ছনা করার জন্য ছুটে গেছে। শিবাদেশে তাকে নিরস্ত করেছেন বীরভদ্র। লক্ষনীয় এ সর্গে যুদ্ধক্ষেত্রে রাবণের দুদ্ধ মূর্তি। অব্যর্থ অস্ত্রের মতােই তার কথাবার্তাও ব্যঙ্গে, তাচ্ছিল্যে, দাঢ়ে অগ্নিস্রাবী।

রামকে সে বলেছে না চাহি তােমারে/আজি, এ বৈদেহীনাথ। এ ভবমন্ডলে। আর একদিন তুমি জীব নিরাপদে!/ কোথা সে অনুজ তব কপট সমরী/পামর?” সুগ্রীব কে ব্যঙ্গ করে বলেছে “ভ্রাতৃবধূ তারা তাের তারাকারা রূপে… বিধবাদশা কেন ঘটাইবি //আবার তাহার, মূঢ়? দেবর কে আছে/আর তার?’

 



শােকে অভিভূত, ক্রোধে প্রজ্জ্বলিত এবং রণােন্মত্ত হয়েও লক্ষণীয় যে-রাবণ বীরভদ্রের কথায় চলেছে যন্ত্রচালিতের মতন। লক্ষ্মণের মৃতদেহ অধিকার করতে গিয়েও সে ফিরে এসেছে শিবানুচর বীরভদ্রেরই মন্ত্রণায়। এতে প্রােজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার শিবভক্তি। রামায়ণও তাকে শৈব বলেছে, কিন্তু শিবপূজা তাকে এ কাব্যে করতে দেখা যায়নি, তবে পঞ্চম সর্গে দেখা গেছে তার দুর্গম চন্ডীমন্দির, শিব যার দ্বাররক্ষী। শিবই রাবণের গৌরবরক্ষীও। রাম বা লক্ষ্মণ যেমন দৈবকৃপাপুষ্ট, রাবণও তেমনি।অবশ্য শিব ছাড়া বাকী সব দেবতাই তার বিপক্ষে। এক এই শিব-সহায়তা রাবণের বীরত্বকে কিছুটা ম্লান করলেও, রামের মতাে দেবতাদের পা ধরে সে বসে নেই বলেই তার বীরমহিমা অপেক্ষাকৃত প্রােজ্জ্বল। রাবণ সহমর্মী স্বামী। রামায়ণ তাকে বহুভতা হয়েও পরদারলােভী, নারীলােলুপ ও ধর্ষকামী হিসাবে চিত্রিত করেছে।

মধুসূদনও রাবণ চরিত্রের এই অপগুণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন তার আভাস রয়েছে তার প্রতি জটায়ুর ভর্সনায়; কিন্তু এ অপগুণকে মধুসূদন আড়াল করতে চেয়েছেন। কেন, তা অনুধাবন করা যাবে না। এ কাব্যে তিনি হাজির করেছেন রাবণের দুই মহিষীকে চিত্রাঙ্গদা এবং মন্দোদরী। চিত্রাঙ্গদার মনে রাবণের প্রতি সমবেদনা আছে কিন্তু সীতাহরণকে সে সমর্থন করতে পারে নি।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ ‘অস্ত্রলাভ’

রাবণ এবং লঙ্কার সমূহ বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে সে সীতাহরণের পাপকেই অর্থাৎ রাবণকেই দায়ী করেছে। তাকেও অপহরণ করে এনে বিয়ে করেছিল রাবণ, সেই ক্ষোভ আজও বিদ্যমান তার ভিতর, তাই স্ত্রী হয়েও চিরকাল রাবণের সঙ্গে সে একটা দূরত্ব বজায় রেখেছিল। তাই ভরা রাজসভায়। দাঁড়িয়ে রাজার মুখের উপর তার পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছে হায়, নাথ, নিজ কৰ্ম্মফলে/মজালে রাক্ষসকুলে, মজিলা আপনি। রাবণ তার সামনে কিছুটা অপ্রস্তুত; এই তীক্ষ্ণ-ধী স্ত্রীর কাছে কথার ভােজবাজিতে নিজের অপরাধ আড়াল করতে সে পারে নি। পক্ষান্তরে মন্দোদরীর কাছ থেকে কোনাে প্রত্যাঘাত পেতে হয়নি রাবণকে।

 



একমাত্র পুত্রের মৃত্যুর পর শােকাভিভূত সে এসে আছড়ে পড়েছে রাবণের পায়ে। শশাকেও স্বামীই তার আশ্রয়। লঙ্কার বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে রাবণ যে রামের প্রতি সূর্পনখার আসক্তিকে প্রচার করত, সেটাই বিশ্বাস করে মন্দোদরী। চিত্রাঙ্গদার মতন স্বাধীন বিশ্লেষণী শক্তি তার নেই, হয়ত স্বামীর প্রতি বিশ্বাসেই। তাই সপ্তম সর্গে রাবণের পক্ষে তাকে মরমী সান্ত্বনা দেওয়া সহজ হয়েছে—“বিলাপের কাল, দেবি চিরকাল পাব!/বৃথা রাজ্যসুখে, সতি, জলাঞ্জলি দিয়া,বিরলে বসিয়া দোঁহে স্মরিব তাহারে/অহরহঃ। সতি’, ‘দোঁহে’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহারে লক্ষণীয় রাবণের প্রেম, সহমর্মিতা বা স্ত্রীর প্রতি সম্মানবােধের ইশারা।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ ‘সমাগম’

রাবণ স্নেহশীল পিতাও। তার অপত্য গভীরতা এ কাব্যে প্রমূর্ত হয়েছে মূলত মেঘনাদকে আশ্রয় করে, কিন্তু বীরবাহুর মৃতুতেও তার মর্মদাহ লক্ষ্য করার। “হা পুত্র! হা বীরবাহু। বলে হাহাকার করে সে, আবার ‘যে শয্যায় আজি তুমি শুয়েছে, কুমার/প্রিয়তম, বীরকুলসাধ এ শয়নে/সদা” বলে পুত্র কৃতিত্বে গৌরববোেধও করেছে। কিন্তু লক্ষণীয়, নবম সর্গের শুরুতে হাহাকার করার সময় সে মেঘনাদ এবং কুম্ভকর্ণের জন্য বিলাপ করেছে, বীরবাহুর কথা তার স্মরণে আসেনি! মেঘনাদের মৃত্যুতে সে এত বেশি বিহুল, কারণ মেঘনাদ ছিল তার অটল ভরসা, বীরবাহু এমন ভরসার পাত্র ছিল না। তার মৃত্যু সংবাদ শুনে রাবণ শােকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মেঘনাদের মৃত্যুসংবাদ শোনা মাত্র হতচেতন হয়ে পড়েছিল সে এবং জ্ঞান ফেরার পরই প্রতিশােধস্পৃহায় হয়ে উঠেছিল ভয়ঙ্কর। কিন্তু পুত্রহাকে মেরেও এ পুত্রশােকে কোনাে সান্ত্বনা নেই। শুনি তার আত্মহারা হাহাকার-

ছিল আশা, মেঘনাদ, মুদিব অন্তিমে
এ নয়নদ্বয় আমি তােমার সম্মুখে-
সঁপি রাজ্যভার, পুত্র, তােমায়, করিব
মহাযাত্রা! কিন্তু বিধি বুঝিব কেমনে
তাঁর লীলা? ভাঁড়াইলা সে সুখ আমারে।

বিরূপ ‘বিধির ষড়যন্ত্রের কথা একাব্যে আগাগােড়া বলেছে রাবণ। যে বিধি জলে শিলা ভাসায়, মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তােলে, সেই বিধিই তার শূলীশদ্ভূ-সম ভাই কুম্ভকর্ণকে মেরেছে রণক্ষেত্রে, মেরেছে বীরবাহু সহ অপরাপর বীরকে, বীরপ্রসূ লঙ্কাকে করেছে বীরশুন্য। বিধিরই ভয়ে মেঘনাদকে তৃতীয়বার যুদ্ধে যাওয়ার আগে রাবণ পাঠিয়েছে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে। কিন্তু সেখানেও মাটি কাটি দংশে সর্প আয়ুহীন জনে। এ বিধি গ্রীক ট্র্যাজেডির সেই নেমেসিস যে নাচায় পুতুল যথা দক্ষ কারিগরে।

 



স্মরণ্য যে নাটক প্রসঙ্গে মধুসূদন বলেছিলেন ‘I shall write-rather try to write as a Greek would have done’ একাব্যেও গ্রীকদের নিয়তি-চেতনাকে তিনি ধ্রুব-সুরের মতাে ধরে রেখেছেন আদ্যন্ত। তারই প্রধান আলম্ব রাবণ। কিন্তু যুক্তি-উদ্দীপনায় নিয়তি-চক্রকে যেমন গ্রহণযােগ্য মনে হয়নি সেক্সপীয়ারের, তেমনি পূর্ব-ভূমির নবজাগরণের কবিও নিঃসন্দিগ্ধ হতে পারেন নি। নিয়তি-লীলায়। তাই তার রাবণ, হাজারবার বিধির কথা বলেও খুঁজতে চেয়েছে তার ট্র্যাজিক ফ্ল। সূর্পনখার অপমানে ব্যথিত হয়ে পাবকরূপনী’ সীতাকে লঙ্কায় আনাকেই সে একদা তার বিপদের কারণ বলে ভেবেছিল, কিন্তু এ প্রত্যয়েও সে তন্নিষ্ঠ থাকে নি, বিধিকেই দায়ী করেছে।

পতনরস্ত্র বাইরে খুঁজেছিল রাবণ, খুঁজত যদি অন্তরে তবে এ চরিত্র উঠে আসত Character is destiny-এই শেক্সপীরীয় অভিজ্ঞানেই এবং তাতেই তার যথার্থ ট্র্যাজিক মহিমা লাভের অবকাশ তৈরী হত। চিত্রাঙ্গদা তাকে মুখের উপর বলেছিল হায়, নাথ, নিজ কৰ্ম্মফলে/মজালে রাক্ষসকুলে, মজিলা আপনি! রাবণ তার জবাব দিতে পারে নি, বরং নিজে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটাই সে পরােক্ষভাবে স্বীকার করেছিল।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু চতুর্থ সর্গ ‘অশোকবন’



মেঘনাদ এসে ঘটনার গতি ঘুরে গেল, কিন্তু সারা কাব্যে স্পষ্টত রাবণ নিজের কাছে নিজেও কখনাে স্বীকার করল না যে লঙ্কা পুড়ছে তার অসংযত কামাগ্নিতে। যদি তা করত তবে তার মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেত, এমন কি মেঘনাদের মৃত্যুর পরও যদি সে মনের বিচারালয়ে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করত—যেমন করেছিল ম্যাকবেথ, ওথেলাে বা লিয়ার, তবে রাবণ হত যথার্থ এক ট্র্যাজিক চরিত্র। বিচারক্ষেত্রে ভাবের ঘরে চুরি করে বিধির ঘাড়ে বারংবার দোষ চাপিয়ে এবং নিরপরাধ চিত্তে হাহাকার করে নিজেকে রাবণ ঠেলে দিয়েছে করুণ প্রস্রবনে; সে হয়নি ট্র্যাজিক, হয়েছে প্যাথেটিক চরিত্র।



যে ভুল রাবণ করেছে, তার উৎসমূল অবশ্যই কবির ধারণাশক্তি। রাবণের অপরাধকে চিনেও বিস্মৃত হতে পেরেছেন বলেই এবং রাবণের বীরত্ব, ঐশ্বর্য, রাজসিকতা, পিতৃত্ব, পতিত্ব ইত্যাদি গুণগুলােকে স্পষ্ট এবং কিঞ্চিদধিক অতিশায়িত করে দেখেছেন বলেই রাবণ সম্পর্কে যে ধারণা মধুসূদন কবিচিত্তে গড়ে উঠেছিল তাই তাকে অনুপ্রাণিত ও উদ্দীপিত করে থাকবে।

এক্ষেত্রে তার মধ্যে অবশ্যই ক্রিয়াময় হয়েছে যুগের দ্রোহবুদ্ধিও। | তবে শিল্পারূপায়নের দিক থেকে রাবণের যে চারিত্র্য-স্বরূপ গড়ে উঠেছে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে, তার নানাগুণ সমবায়ে এবং সংহতির নিটোলতায়, গভীরতায় এবং ব্যক্তিত্বের ব্যাপ্তিতে যুগে শুধু নয়, এ যুগকেও সে বিস্ময়ে আবিষ্ট করে।



মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য – কৃষ্ণগোপাল রায়

আরো পড়তে পারেন

Spread the love

3 thoughts on “মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু নবম সর্গ ‘সংস্ক্রিয়া’ – Debota Hembram

  2. Pingback: মধুসূদনের প্রমীলা চরিত্রটি নবযুগের নব সাহিত্যের সূচনার পরিচয় » Debota Hembram

  3. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *