Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.

মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ সর্গ ‘বধ’

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের ষষ্ঠ সর্গের নাম কবি দিয়েছেন ‘বধ’। এই বধ বলতে বােঝানাে হয়েছে মেঘনাদবধকে। সর্গটির নামকরণের সার্থকতার বিচারে আমাদের পর্যালােচনা করতে হবে এই ঘটনাটিই সর্গে উপস্থাপিত কথাবস্তুর কেন্দ্রীয় ঘটনা কিনা। যদি তা হয়, তবে এ নামকরণকে আমরা শিল্পসঙ্গত বলব, কেননা উপস্থাপিত বিষয়ের কেন্দ্রীয় ঘটনার নামে রচনার নামকরণ শিল্পশাস্ত্রসম্মত। স্মরণ্য, এই সর্গের নামকে গুরুত্ব দিয়েই সমগ্ৰ কাব্যটির নামকরণ করেছেন মাইকেল, সেদিক থেকে সতত স্পষ্ট যে এই সর্গটিকেই তিনি দিয়েছেন সমগ্র কাব্যের কেন্দ্র-স্থানীয়েরও মর্যাদা। তবে এ সর্গ কাব্যের নয়টি সর্গের কেন্দ্র-স্থানীয় কিনা। এবং এ সর্গের নামকে গুরুত্ব দিয়ে সমগ্র কাব্যের নামকরণ করা শিল্পসঙ্গত হয়েছে কিনা সে বিচার আলাদা। এখানে ষষ্ঠ সর্গে সমায়য়াজিত ঘটনাধারাকে প্রতিফলিত করে এর ‘বধ’, নাম সার্থক হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা তাই লক্ষ্য করা যেতে পারে।

ষষ্ঠ সর্গের কথা শুরু প্রত্যুষে এবং সে কথা মেঘনাদ নয়, শুরু হয়েছে লক্ষ্মণকে নিয়ে। লক্ষ্মণ দুর্গম অরণ্যে প্রবেশ করে সর্ববাধা পেরিয়ে দেবী-দেউলে মাতা চণ্ডিকার পুজো করেছেন এবং তাঁর আশীর্বাদ লাভ করে শিবিরে ফিরে এসে অগ্রজকে জানিয়েছেন তার অভিজ্ঞতার কথা। সব শােনার পরেও মেঘনাদ-বিজয়ে অনুজকে পাঠাতে ভয় পেয়েছেন স্নেহশীল রাম। লক্ষ্মণই তাকে বুঝিয়েছেন ইন্দ্র, মহাদেব, পার্বতী যার প্রতি কৃপাপন্ন, দৈববলে যে বলী, সে নিরাপদ; লক্ষ্মণকে সমর্থন করে বিভীষণ রামকে শুনিয়েছেন তাঁর স্বপ্নের কথা: স্বপ্নে রক্ষকুল-রাজলক্ষ্মী তাঁকে ভাবী রাক্ষসাধিপতি হিসাবে অভিষেক করেছেন। সুতরাং বাসববিজয়ী হলেও ইন্দ্রজিৎকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই।

রাম তবু আবেগে ভেসেছেন মাতা, পত্নী, পৌরজনদের অনুরােধ অস্বীকার করে লক্ষ্মণের তার সঙ্গে বনে আসার বদান্য কথায়, সুমিত্রা মাতার ‘রাখিস যতনে এ মাের রতনে তুই’ এই দায়িত্ব অর্পনের স্মৃতিতে। লক্ষণের মতাে ভাইকে হারানাের চেয়ে সীতাকে উদ্ধার না করে বনবাসে ফিরে যাওয়াই ভালােইত্যাদি বিহ্বলতাও পেয়ে বসেছে তাকে। কিন্তু অকস্মাৎ আকাশবাণী শুনেছেন তিনি, ‘দেবাদেশ, বলি, কেন অবহেল? তারপর আকাশে দেখেছেন ময়ুর এবং সাপের প্রতীকী যুদ্ধ, যার পরিণামে ময়ূর হেরে গেছে। বিভীষণ ব্যাখ্যা করেন এ দুশাের। তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাম নিজে দৈব-অস্ত্রে যুদ্ধসাজে সাজান অনুজ লক্ষ্মণকে। তারপর লক্ষ্মণ বিভীষণের সঙ্গে যাত্রা করেন নিকুন্তিলা যজ্ঞাগারের উদ্দেশ্যে। রাম শরণাপন্ন হন দুর্গার।—মায়া রক্ষকুল রাজলক্ষ্মীকে অনুরােধ করেন রামের প্রতি প্রসন্ন হতে। সেই অনুরােধে লক্ষ্মী রামকে কৃপা করলে লঙ্কায় তার পূজাগৃহের মঙ্গলঘট ভেঙে যায়, শুকিয়ে যায় কলাগাছ, লঙ্কা শ্রীভ্রষ্ট হয়। মেয়েকে তিনি পাঠিয়ে দেন লঙ্কায় লক্ষ্মণকে সাহায্য করার জন্য।

মায়ার সহায়তায় লঙ্কাপুরীর মধ্যে প্রবেশ করেন লক্ষণ ও বিভীষণ। লক্ষ্মণ ছোঁয়ামাত্রই বিকট শব্দে খুলে যায় লঙ্কার দরজা, রাক্ষসেরা কেউ শুনতে পায় না সেই শব্দ। রক্ষবীরেরা তখন মায়াপ্রভাবে অন্ধ, কেউ দেখতে পায় না লক্ষ্মণদের আগমন। যজ্ঞাগারের দিকে যেতে যেতে লক্ষ্মণ দেখেন পুরী মধ্যে যুদ্ধের বিপুল তৎপরতা, শুনতে পান যুদ্ধজয় সম্পর্কে পুরবাসীদের নিশ্চিন্ত কথােপকথন।

 

নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করলে পূজামগ্ন ইন্দ্রজিং লক্ষ্মণের আগমন শব্দে চমকে চোখ মেলে তাকায় এবং লক্ষ্মণকে দেখে ভাবে যে তার আরাধ্য প্রভুই বুঝি এসেছেন শত্রুবেশে। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে এ-ছলনার কারণ জানতে চায় সে। কিন্তু নিজ পরিচয় দিয়ে লক্ষ্মণ তাকে অবিলম্বে যুদ্ধে আহ্বান করলে ভীত হয় মেঘনাদ। তবু লঙ্কার যাবতীয় প্রহরা পেরিয়ে লক্ষ্মণের পক্ষে এখানে আসা অসম্ভব বিবেচনা করে সে আবার বিভাবসু ভ্রমে রিপু লক্ষ্মণের কাছেই শত্রুগুয়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। লক্ষ্মণ বলেন—আয়ুহীন ব্যক্তিকে সাপ মাটি কেটে এসে দংশন করে; দৈবশক্তিতে শক্তিমান হয়ে দেবতাদেরই নিত্য অবহেলা করার ফল এবার পাবে মেঘনাদ। এই বলে ভয়ঙ্কর তরবারি নিষ্কাশন করেন তিনি। কিন্তু ইন্দ্রজিং বলে রক্ষশত্রু হলেও এখন লক্ষ্মণ তার অতিথি, তিনি আতিথেয়তা গ্রহণ করুন; ততক্ষণে যুদ্ধসাজে সেজে এসে লক্ষ্মণের যুদ্ধসাধ সে পূরণ করবে। লক্ষ্মণকে সে স্মরণ করিয়ে দেয়, নিরস্ত্র শত্রুকে অস্ত্রাঘাত করা ক্ষাত্রধর্ম-বিরুদ্ধ। লক্ষ্মণ বলেন, রাক্ষসকুলে যার জন্ম তার সঙ্গে ক্ষাত্রধর্ম কিসের? যে কোনাে উপায়ে তিনি শত্রু নিধন করবেন। বিপন্নদশাতেও এবার জ্বলে ৮ মেঘনাদ, ধিক্কার দিয়ে লক্ষ্মণকে বলে যে সে ক্ষত্ৰকুলের কলঙ্ক, চোরের মতাে যেমন সে যজ্ঞাগারে প্রবেশ করেছে তেমনি চোরের মতাে শাস্তি দিয়েই তাকে সে নিরস্ত করবে। চোখের নিমেষে কোষা তুলে লক্ষ্মণের মাথায় ভয়ঙ্কর আঘাত করল সে। লক্ষ্মণ মূচ্ছিত হয়ে পড়লেন। তখন মেঘনাদ তার অস্ত্রগুলাে কেড়ে নিতে চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যর্থ হল মায়ার কৌশলে। এবার পালাতে চাইল মেঘনাদ, কিন্তু সামনে দেখল পথরােধ করে দাঁড়িয়ে আছেন বিভীষণ।

বিভীষণকে দেখে মেঘনাদ বুঝতে পারল লক্ষ্মণকে কে এনেছে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে। তাকে ধিক্কার দিতে গিয়ে তবু পিতৃব্য বিবেচনায় নিজেকে সম্বরণ করল সে এবং পথ চাইল। অস্ত্রাগারে যাওয়ার। বিভীষণ সে পথ দিলেন না। মেঘনাদ তার দেশ কুল ইত্যাদির দোহাই দিলে বিভীষণ জানালেন লঙ্কেশ্বরই নিজের পাপে তার দেশ, কুল এবং নিজেকে মজিয়েছেন। প্রত্যুত্তরে ক্ষুরধার ভাষায় মেঘনাদ তঁাকে আক্রমণ করার সময় জ্ঞান ফিরে পেলেন লক্ষ্মণ। তীক্ষ তীরে তিনি বিধলেন ইন্দ্রজিৎকে। রক্তের ধারা অনিরুদ্ধ হল, ব্যথায় কাতর মেঘনাদ ঘণ্টা, শঙ্খ এইসব ছুঁড়ে মারতে লাগল লক্ষ্মণকে কিন্তু অলক্ষ্যে থেকে মায়া একটিও আঘাত লক্ষ্মণকে লাগতে দিলেন না। তখন ভীষণ গর্জন করে মেঘনাদ ছুটে গেল লক্ষ্মণের দিকে, কিন্তু মায়ার কৌশলে সে সামনে দেখতে পেল মহিষপিঠে শূলহস্ত যমকে, মহাদেবকে, শঙ্খ চক্র-গদাধরী নারায়ণ এবং অন্যান্য দেবরথীদের। এবার নিশ্চল হয়ে পড়ল মেঘনাদ। লক্ষ্মণ তখন ধনু ছেড়ে তরবারি বের করলেন এবং তারই ভয়ঙ্কর আঘাতে ভূপাতিত করলেন তাকে।

 

লঙ্কার গৃহকোণে অকস্মাৎ ভুলে প্রমীলার সিঁদুর মুছে গেল, মূচ্ছিত হয়ে পড়লেন মন্দোদরী, ঘুমের মধ্যে মাতৃক্রোড়ে কেঁদে উঠল শিশু। মেঘনাদ লক্ষ্মণকে বলল, মৃত্যুকে তার ভয় নেই, কিন্তু তার মতাে কাপুরুষের হাতে মরার গ্লানি সে ভুলতে পারছে না। তবে রাবণ এ সংবাদ পেলে লক্ষ্মণের রক্ষা নেই, সমুদ্রতলে লুকালেও সে পার পাবে না।

পিতামাতা এবং প্রমীলার কথা ভাবতে ভাবতে মারা গেল মেঘনাদ। শোকে বিভীষণ বিলাপ করতে লাগলেন এবার। লক্ষ্মণ তাঁকে প্রবােধ দিলেন। তারপর শিবিরে অপেক্ষারত রামের কাছে ফিরে এসে সব সংবাদ জানালে হৃষ্ট হয়ে রাম লক্ষ্মণের ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং বলদাতৃ দেবতার পূজা করতে বললেন। রাঘবকুল-মঙ্গল রূপে বিভীষণেরও যথেষ্ট প্রশংসা করলেন রাম। তারপর কৃতজ্ঞচিত্তে ব্ৰতী হলেন দুর্গার আরাধনায়। দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতে লাগলেন; চারদিকে রামচন্দ্রের জয়ধ্বনি উচ্চকিত হয়ে উঠল; সেই ধ্বনিতে আতঙ্কিত হয়ে ঘুম ভাঙল স্বর্ণলঙ্কার।

 

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের ষষ্ঠসর্গের কথাবস্তু এই। এ সর্গের চরণ সংখ্যা ৭৪৪। লক্ষণীয় যে অর্ধাংশেরও বেশি সংখ্যক চরণে বিবৃত হয়েছে মেঘনাদ-হত্যার পূর্বকথা; মেঘনাদের সঙ্গে লক্ষ্মণের বাকযুদ্ধে ব্যয়িত হয়েছে প্রায় এক চতুর্থাংশ পংক্তি, বাকি অংশে উপস্থাপিত হয়েছে। মেঘনাদ-হত্যা, বিভীষণের বিলাপ, তাকে লক্ষ্মণের প্রবােধ, রাম কর্তৃক লক্ষ্মণ ও বিভীষণের প্রশংসা ও দেবতাদের আশীবাদ-প্রসঙ্গ। মেঘনাদ-হত্যার প্রস্তুতি কথা দীর্ঘায়িত ক ভরা দীর্ঘায়িত করা হয়েছে বধ-ক্রিয়ার দুঃসাধ্যতাকে প্রমূর্ত করে তােলার জন্য। মেঘনাদ এবং লক্ষ্মণের বাক্য এবং লক্ষ্মণের বাকযুদ্ধে ব্যঞ্জিত হয়েছে লক্ষ্মণের কাপুরুষতা এবং মেঘনাদের বীর্যবস্ত চারিত্র্য স্বরূপ তার মা ত স্বরূপ যা তার মৃত্যুকেও করে তুলেছে মহীয়ান। তার মৃত্যুর পর বিভীষণের বিলাপ, লক্ষ্মণ কর্তৃক তাকে প্ররে রামচন্দ্রের দৈর্ঘ্য কিম্বা দেবতাদের হর্ষিত পুষ্পবৃষ্টি সবই ঐ বধ ক্রিয়া সম্পন্নতার অবনতি ফলশ্রুতি। অতএব, এই বধ ক্রিয়াই যে এ সর্গের কেন্দ্রীয় ঘটনা এতে কোনাে সন্দেহ নেই। আর, কেন্দ্রীয় ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে সর্গের নামকরণ করায় সে নামকরণকে যথার্থ ও শিল্পসম্মত বলায়ও কোনাে বাধা নেই।

প্রসঙ্গত লক্ষণীয় ‘বধ’ শব্দের নিহিত ব্যঞ্জনাও। যুদ্ধ করে যে মৃত্যু, তাকে বলি ‘পরাভব’। মেঘনাদ মরেছে কিন্তু পরাভূত হয়নি, কারণ যুদ্ধ করার সুযােগই পায়নি সে। স্বর্গের দেবতারা প্রথমাবধি তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, ষড়যন্ত্রের ফলেই পূজাগৃহে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় তাকে আক্রমণ করা হয়েছে, তাও লক্ষ্মণ নিজ-অস্ত্র নিয়ে আসেন নি, এসেছেন দৈবাস্ত্র নিয়ে; একাও আসেন নি, সঙ্গে এনেছেন বিভীষণকে; তদুপরি অলক্ষ্যে এসেছেন মায়াদেবী। দীর্ঘ ষড়যন্ত্রে দেবতা-মানুষ মিলে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় মেঘনাদকে হত্যা করা হয়েছে বলেই ঘটনাটিকে বধ অভিহিত করেছেন কবি। এতে তার শব্দ-চেতনা সম্পর্কে সচেতন হতে হয় আমাদের।

 

বন্ধুকে মধুসূদন জানিয়েছিলেন এ সৰ্গ বিশেষ করে মেঘনাদ নিধন-দৃশ্য রচনা করতে গিয়ে তিনি বহু অশ্র বিসর্জন করেছেন, কিন্তু অশ্র-সর্জনী সে আবেগে শিল্পের আবেদন ক্ষুয় হয় নি কোথাও; এইখানে টের পাই মধুসূদন-প্রতিভার কৌলীন্য।

মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য – কৃষ্ণগোপাল রায়

আরো পড়তে পারেন

Spread the love