Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.
মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র

 

“প্রমীলা” মাইকেলের চরিত্রসৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন। মেঘনাদের জীবনের ঐশ্বর্য ও মৃত্যুর মহিমা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করিবার জন্য কবি মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এর অবতারণা করিয়াছেন। মেঘনাদবধ কাব্য বীর ও করুণরস প্রধান, কিন্তু ইহার মধ্যে যে জিনিসটি সর্বাপেক্ষা প্রোজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে তাহা হইল গার্হস্থ্য- জীবনের পবিত্রতা।

প্রমীলা, সীতা, সরমা এবং মন্দদরী, এই চারটি চরিত্রের প্রসঙ্গে কবি ইহা পরিস্ফুট করিয়াছেন নিপুণভাবে। মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র চিত্রণে কবির অন্যতম কৃতিত্ব এইখানে যে, স্বল্পতম আয়তনে ও কাব্যের বহুবিচিত্র তাগিদের মধ্যে তিনি তুলিয়া ধরিয়াছেন প্রমীলার নারী – সত্তাটির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র। এমন সম্পূর্ণ জীবন- চিত্র এই কাব্যে আর একটিও নাই।

তৃতীয় সর্গটি বিশেষভাবে প্রমীলার জন্য আয়োজিত বটে, কিন্তু উহাতেই তাহার সমগ্র পরিচয় নহে। বীরাঙ্গনা প্রমীলার এইখানেই চরম অভিব্যক্তি ঠিকই, কিন্তু প্রমীলার যে বীরাঙ্গনা ছাড়া আরও পরিচয় আছে তাহাই প্রথম, পঞ্চম ও নবম সর্গের বিভিন্ন অংশ পরিব্যাপ্ত।



মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্রটি যেন এক হিসাবে সমগ্র মেঘনাদবধ কাব্যের মৌল-চরিত্রের প্রতীকস্বরূপ। কাব্যের মতো এই চরিত্রটিও অশ্রুধারায় শুরু ও অশ্রুধারায় সমাপ্তি। প্রথম সর্গের শেষভাগে যখন সর্বপ্রথম আমরা মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্রকে দেখিলাম তখন তিনি অশ্রুমুখী, বিরহাশঙ্কায় নিতান্ত কাতরা। পঞ্চম সর্গের শেষেও ওই একই চিত্র, বরং বিচ্ছেদের আতঙ্ক-ছায়া আরও গাঢ় প্রলেপে করুণতর করিয়াছে”ভুবন-মোহিনী সতী প্রমীলা সুন্দরী”র ভূবন-মোহন চিত্রখানি।

কী নির্মম সত্যই না সংকেতিত হয় যখন রোদন-বিবশা প্রমিলাকে সান্ত্বনা দিবার জন্য মেঘনাদ বলেন,”সৃজিলা কি বিধি, সাধ্বী , ও কমল- আঁখি কাঁদতে?”অতঃপর নবম সর্গের তো কথাই নাই, সেখানে আশ্রুবর্ষনের সহজ স্বস্তি হইতেও প্রমীলা বঞ্চিত। উদ্ গত অশ্রু-প্রবাহ জমাট বাঁধিয়া প্রমীলাকে কহিয়াছে:

মৌনব্রতে ব্রতী বিধুমুখী
পতির উদ্দেশে প্রাণ ও বরাঙ্গ ছাড়ি
গেছে যেন যথা পতি বিরাজেন এবে!

সুতরাং কবি-কল্পনায় প্রমীলার পরিমন্ডলটি অশ্রুসিক্ত বলিতে হইবে। এই প্রচ্ছদপটেই তিনি আঁকিয়াছেন তাঁহার নায়িকার জীবন-চিত্র যাহাতে বীরাঙ্গনাসুলভ আবেদনটি প্রাধান্য পাইয়াছে। বিস্তারিত আলোচনায় প্রবৃত্ত হইবার পূর্বে একবার সমগ্র প্রমীলাকে দেখিয়া লওয়া যাউক।


মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র
মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র/প্রমীলা মেঘনাদের সুযোগ্যা পত্নী। ইন্দ্রজয়ী মেঘনাথ কে তিনি জয় করিয়াছেন সতী নারীর সর্বজয়ী প্রেমের বলে। মেঘনাদের উক্তি-“ইন্দ্রজিতে জিতি তুমি, সতি, বেঁধেছ যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে সে বাঁধে”- কেবলমুখের আদর নহে, এ এক পরম সত্য। বীরর্ষভ ইন্দ্রজিতের প্রমোদ উদ্যানে যে প্রমোদ-বিহার তাহা কবি- কল্পনায় বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণ-বিহারের সাদৃশ্য প্রাপ্ত হইয়া আছে অবশ্যই প্রমীলার চরিত্র-বৈশিষ্ট্যে। নারী যে ধৃতিরূপিণী, প্রমীলার মধ্যে তাহার কতই না মহিমাময় পরিচয় ওই ইন্দ্রজিতের ন্যায় দেব-দৈত্য-নর- ত্রাস রণরঙ্গে মত্ত বীরকুঞ্জরকে আপনার প্রেমাঞ্চলে ধারণের মধ্যে।

পতিপ্রেম-মুগ্ধা বলিয়া সামরিক পতি-বিরহ প্রমীলার পক্ষে অসহ্যনীয়। তৃতীয় সর্গের প্রথমাংশে তাই দেখা যায় তাঁহার প্রতীক্ষা-কাতরতা, অস্থিরতা ও এক বিপুল শূন্যতাবোধ। কখনও পতি-বিরহ- কাতরা এই যুবতী বিরহিনী কপোতীর ন্যায় শূন্য নীড়ে বিবশা, কখনও উচ্চ-গৃহ চূড়াই উঠিয়া সজল চক্ষে একদৃষ্টে চাহিয়া থাকেন, কখনও বা সখীর পরামর্শে কানুনে প্রবেশ করিয়া ভারী মিলনের আশায় পুষ্পচয়নপূর্বক মালা গাঁথিয়া চোখের জলে বুক ভাসাইয়া দেন।

ইহার পরেই অঙ্কিত হইয়াছে প্রমীলার লঙ্কাপুরী অভিযান ও পুরী-প্রবেশ-দৃশ্য। প্রণয়িনীর এই রঙ্গরঙ্গিনীরূপ অবশ্যই পৃথক আলোচনার বিষয়। যথাস্থানে উহা সন্নিবেশিত হইবে। কিন্তু ইহা যে প্রমীলা জীবনের বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা বা তাহার চরিত্রের কোন সৃষ্টিছাড়া পরিচয়, তাহা নহে। এই অভিযান তাঁহার লক্ষ্যে পৌঁছিবার উপায় মাত্র। লক্ষ্যদ্বারাই মানুষকে চিনিতে হইবে, উপায় দ্বারা নহে।


তাই দেখা যায়, পুরী-মধ্যে প্রবেশমাত্র প্রমীলা বীর ভূষণ পরিত্যাগ করিয়া সেই চিরানন্দ প্রেমময়ীরূপে মেঘনাদকে পাইয়া প্রকৃতিস্থ হইলেন।”মনিহারা ফনী যেন পাইল সে ধনে!” “পশিলা সাগরে আসি রঙ্গে ততঙ্গিনী!”ইহাই অভিযান- রতা প্রমীলার স্বরূপ। মিলন-মুহূর্তে প্রথম কৌতুকালাপের ঢেউ থামতেই প্রমীলাকে বলিতে শুনা শুনা যায় তাঁহার প্রাণ উজাড় করা কথা যে, তিনি প্রতিপদ – প্রসাদে সবই জয় করিতে পারেন,”বিরহ-অনলে (দুরূহ) গড়াই সদা; তেই সে আইনু, নিত্য নিত্য যারে চাহে, তাঁর কাছে!”ইহাই প্রমীলার রনরঙ্গিনীরূপ পরিগ্রহের মর্ম ব্যাখ্যা।

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র কাহিনী সুসংবদ্ধভাবে অগ্রসর হইয়া চলিয়াছে। মিলিত দম্পতির মধুময় যামিনী-যাপনের সংকেত পর্যন্ত পাওয়া গেল তৃতীয় সর্গে, পঞ্চম সর্গে উন্মোচিত হইল নিদ্রাভঙ্গের দৃশ্য। রণরঙ্গিনী প্রমীলাকে মনে রাখিবার কোন কারণই এখানে দেখা যায় না। ইহা একান্তই মেঘনাদ-প্রমীলার ঘরোয়া দাম্পত্য-জীবনের নিত্যদিনের চিত্র বিশেষ। এই নিত্যকার পরিচয়ের মধ্যেই যে প্রমীলা-জীবনের বহু বৎসরের, বুঝি, সেই স্বপ্লায়ত জীবনের প্রশস্ততম যুগের কাহিনি ধরা পড়িয়াছে, তাহা বলাই বাহুল্য।

প্রমীলা মেঘনাদের ‘ চিরানন্দ’; মেঘনাদ ‘ সূর্যকান্তমণি’, প্রমীলা তাহার ‘রবিচ্ছায়া’- ইহাই প্রমীলার শাশ্বত পরিচয়। যোগ্য পতির যোগ্য পত্নী, যোগ্য পুত্রের যোগ্য পুত্রবধূ প্রমিলা মেঘনাদের কেবল নর্মসহচরী নহেন, মর্ম সহচরীও বটেন। কায়মনোবাক্যে সহধর্মিনী বলিয়া প্রমীলা স্বভাবতই বীরপত্নীর উপযোগী বীরধর্মে দীক্ষিতা। তাই কেবল প্রমোদ বিহারে নহে, যেমন কর্তব্য-মধুর গার্হস্থ্য-জীবনের অঙ্গীভূত দিন, রজনী যাপনে, তেমনি বিশেষ কর্তব্যের ডাকে সতর্ক পদক্ষেপ, এমনকি সামরিক উদ্যোগেও প্রমীলা মেঘনাদের নিত্যসহচরী। যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতিপর্বে জননীর আশীর্বাদ গ্রহণে তাই প্রমীলার সাহচর্য মেঘনাদের পক্ষে অপরিহার্য, আর প্রমীলার পক্ষে ওই সাহচর্য জীবনের সার্থকতার অঙ্গস্বরূপ।


এখানে প্রমীলার নিজস্ব কোনো সক্রিয় ভূমিকা নাই, কিন্তু তবু তাঁহাকে বাদ দিলেই চিত্রখনির বিরাট অঙ্গহানি সহজেই অনুমেয়। তাঁহাকে ঘিরিয়া বিরাজ করিতেছে নীরব অথচ প্রজ্বল একটি পূর্ণতার জ্যোৎস্না- লোক, সেই আলোকেই আলোকিত মেঘনাদের, মন্দোদরীর, তাথা রাবণের জগৎ। রানী মন্দোদরী যে ভাগ্যবতী, সে কেবল ভুবন- বিজয়ী বীর ইন্দ্রজিতের জন্য নহে,-

… ভাগ্যবতী তুমি!
ভুবনবিজয়ী শূর ইন্দ্রজিৎ বলী-
ভুবন-মোহন সতী প্রমিলা সুন্দরী।

ভীষণ কঠোর দায়িত্ব কর্তব্যের আহ্বানে অগ্রসর হইয়া চলিয়াছেন মেঘনাদ কানন মধ্যবর্তী যজ্ঞশালা অভিমুখে। এখানে আর প প্রমীলা-ভূমিকার অবসর কোথায়? কিন্তু কেবল একটি নিষ্ক্রিয় সাহচর্য-দানে পতিগতপ্রানা প্রমীলার হৃদয় ভরে কেন? তাই ত্রস্তপদসঞ্চারে পতিকে অনুসরণ করিয়া আকুলকণ্ঠে ইনি জানাইলেন,”ভেবেছিনু, যজ্ঞগৃহে যাব তব সাথে; সাজাইব বীরসাজে তোমায়”। যোদ্ধাপতিকে যুদ্ধসাজে সাজাইয়া দেওয়া যোদ্ধৃ-সহধর্মিনীর শুধু জীবনের স্বাদ নয়, পরম কর্তব্য।

প্রমীলা শুধুই প্রেম-সচেতন নহেন, কর্তব্য সচেতনও। আর সেই কর্তব্য কেবল পুরী- প্রবেশের সামরিক সমারোহে প্রকাশ পায় নাই, বরং সেখানে উহার একটি আকস্মিক চমকপ্রদ অভিব্যক্তি মাত্র; কর্তব্য-চেতনায় প প্রমীলা আসিয়া যুদ্ধগামী পতিকে যুদ্ধসাজে সাজাইতে না পারার জন্য আক্ষেপ করিয়াছেন; কিন্তু কেন তিনি পারেন নাই? পুত্রকে বিদায় দিয়ে রোদন- বিবশা মাতা মন্দোদরী অকূলকণ্ঠে পুত্রবধূকে জানান,”থাক, মা, আমার সঙ্গে তুমি; জুড়াইব, ও বিধুবদন হেরি, এ পোড়া পরণ!” মাতার এই স্নেহাকুল আবেদন কী প্রমীলা অগ্রাহ্য করিতে পারেন?


আদর্শপূত গার্হস্থজীবনে আবেগের উদ্দামতার কোন স্থান নেই। রীতি-শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের পবিত্র সংযমে জীবনকে সংযত রাখতে হয়। পতির জন্য আকুলতা যতই উদ্দাম হউক শ্বশ্রুর প্রতি কর্তব্য তাহাতে উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়! গৃহবধুর এই বিধান জীবনের সঙ্কট মুহূর্তেও প্রমীলাআগ্রহ করেন নাই। এখানেই পাওয়া যাইবে প্রমীলার কর্তব্য চেতনার একটি মধুর পরিচয়।

এইভাবে মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র চিত্র পূর্ণতার পথ ধরিয়া পর্যায় পরম্পরায় বিকশিত হইয়া চলিয়াছে। আবেগপূর্ণ ক্ষণিক সংলাপের ঘোর কাটাইয়া মেঘনাদ চলিয়া গেলেন। কিন্তু তখনও প্রমীলার কাজ শেষ হয় নাই। তিনি একদৃষ্টে চাহিয়া রহিলেন, ঠিক যেমন বিচ্ছেদ কাতরা তরুণী বধূ বিদায়ী পতির গমনপথে বিরহিণীর আকুলতা ঢালিয়া দিয়া চাহিয়া থাকে। প্রমিলা তখনও জানে না, এই দেখাই তাঁহার শেষ দেখা। কিন্তু না জানিলেও ভাবী বিপদের ছাপাতে তাঁহার আচরণে, বুঝি, তাঁহারই অজ্ঞাতে ফুটিয়াছে উহার করুন সংকেত।

সেই প্রেম- কাতর তরুণী হৃদয় একবার সবল হইতে চাহিল স্বামীর গমন- ভঙ্গিতে কুঞ্জরাধিকা মাধুর্য ও মহিমা পর্যবেক্ষণে অথবা বাসব- বিজয়ী স্বামীর সর্ব- জয়ী শক্তির স্মরণে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাঙিয়া পড়িল আকুল প্রার্থনায়, যাহা পতিপ্রানা সতীর সর্বশেষ আশ্রয়। পতির পৌরুষ বা শৌর্যবীর্যের উপর সদম্ভ নির্ভর নহে, জগন্মাতার কৃপদৃষ্টির কাছে ঐকান্তিক আত্মসমর্পণই পতিগতপ্রানা প্রমীলা সুন্দরীর শেষ অবলম্বন।


জগদম্বার কৃপা প্রার্থনার সুরে ও ভঙ্গিতে প্রমীলার যে স্বরূপ উদঘাটিত হইয়াছে তাহাতে সেই প্রেমময়ী পতিব্রতার অভ্যন্তরস্থ শাশ্বত নারী- হৃদয়ের অনবদ্য স্পন্দন অনুভব করিয়া আমরা বুঝি, ইহা সেই প্রথম সর্গের উচ্ছল প্রেমের বশবর্তিনী প্রমিলা নহে, পরিণত প্রেমের প্রসাদ-ধন্যা, নারীত্বের সম্পূর্ণতার অধিকারিণী, পরিণত প্রমিলা।

আরো পড়তে পারেন: মধুসূদনের প্রমীলা চরিত্রটি নবযুগের নব সাহিত্যের সূচনার পরিচয়

কিন্তু এখনও কবি-পরিকল্পিত প্রমীলা- কাহিনি শেষ হয় নাই। নবম সর্গে উহারই উপসংহার। আদি, মধ্য ও অন্ত্য, জীবনের এই তিনটি যুগই মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র-চিত্রে প্রতিফলিত। প্রথম যুগের তারুন্যেচ্ছ্বাস, মধ্যযুগের কর্তব্য-কঠোরতা ও অন্ত্যযুগের করুণ বৈরাগ্য, নবীন প্রেমোচ্ছল প্রমোদ-বিহার হইতে একেবারে স্বামীর চিতায় আরোহন পর্যন্ত- একটি পরিপূর্ণ নারীজীবন-সতীত্বের আদর্শ পূজারিণী সনাতন ভারতীয় নারী-চিত্র, এই প্রমীলার মধ্যে স্তরে স্তরে বিকশিত হইয়াছে।

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্রটির আংশিক পরিকল্পনায় কবি হয়তো’হেক্টরবধ’ কাব্যের হেক্টর পত্নী এন্ডোমেকিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করিয়াছেন, তথাপি স্বকীয় পরিকল্পনা রঙে তিনি এই চিত্রটি এমন বর্ণাঢ্য করিয়া আঁকিয়াছেন যে, সমগ্র কাব্যখানিতে প্রমীলা একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়া আছে নিজস্ব মহিমায়।


প্রমীলার পরিকল্পনার মধ্যে যে একটি আপাত- বিরোধ আছে, কুলবধূ ও বীরাঙ্গনা, প্রণয়িনী ও রণরঙ্গিনীর সমন্বয় বিসদৃশ হইয়াছেকি না, তাহা কৌতুহলী সমালোচনার বিষয়।প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচ্য এই পরিকল্পনায় মধুসূদনের মৌলিকতা। এ বিষয়ে যোগীন্দ্রনাথ বসুর আলোচনা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য।”প্রমীলা বীর্যে ভৈরবী, কিন্তু কোমলতায় কুলোবধূর আদর্শস্থানীয়। কোমল বল্লরীর ন্যায় স্বামীকে অবলম্বন করিয়াই, তিনি জীবিতা; কিন্তু অবস্থা বিশেষে, তিনি যে বীরপতির সহচারিনী হইবার উপযুক্তা, তাহারও পরিচয়দানে পরাঙ্খুখী নহেন।

মেঘনাদবধ রচনা আর সময়ে মধুসূদন অতি যত্নের সহিত ট্যাসোর”জেরুজালেম উদ্ধার”কাব্য পাঠ করিতেছিলেন। সম্ভবত তাহা হইতেই তিনি প্রমীলা-চরিত্র রচনা প্রণোদিত হইয়াছিলেন। আমরা প্রথম সর্গে দেখিতে পাই, প্রমিলা বনদেবীর ন্যায় স্বামীর সঙ্গে প্রমোদ উদ্যানে ক্রীড়া-পরায়ণা; কবি প্রমীলার প্রমোদ-উদ্যানের যে চিত্র প্রদান করিয়াছেন, তাহা সৌন্দর্যে অতুলনীয়।

ট্যাসোর কাব্যের ষোড়শ সর্গ হইতেই কবিতা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। প্রথম অঙ্কে প্রমিলা ও মেঘনাদকে সেই প্রমোদ-উদ্যানে দেখিয়া আমাদের কুহকিনী আর্মিডার(Armida) ও প্রমোদ-নিরত রাইনাল্ডোর (Rainaldo) কথা স্মরণ হয়; এবং আর্মিডার পুরীর ন্যায় প্রমীলার পুরীও মায়া-নির্মিত বলিয়া ভ্রম জন্মে।… কিন্তু ট্যাসোর কাব্য হইতে মধুসূদন যদিও তাঁহার মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র নির্মাণে প্রণোদিত হইয়াছিলেন,তথাপি ইহার গঠনপ্রণালী সম্পূর্ণরূপে তাঁহার নিজের। প্রমীলা তাঁহার কল্পনার মৌলিক চিত্র। প্রথম সর্গে প্রমিলা অশ্রুসিক্ত এবং যুদ্ধগামী পতিকে বিদায়দানেঅনিচ্ছাবতী ।




প্রমীলা চরিত্রের এই অংশে কোন নতুনত্ব নাই: কোমলতাময়ী কুলবধূর পক্ষে যাহার স্বাভাবিক, কবি হাতে কেবল তাহাই প্রদর্শন করিয়াছেন। কিন্তু কোমলতার সঙ্গে বীরাঙ্গনার শৌর্যের সম্মিলনেই মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এর নতুনত্ব” সত্যই মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এর মধ্যে নারীর দুইটি সম্পূর্ণ পৃথক পরিচয় উদঘাটন করা যায়। এখানে বিপদ হইল, স্রষ্টার সৃষ্টি নৈপুণ্য সকলে নিঃশেষ নাও বুঝিতে পারেন।

ইদানিংকালের সস্তা সমালোচনার দিনে আশঙ্কা হয় যে, মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এর বিশ্লেষণে একদিকে যখন ভারতীয় শান্ত -মধুর কুলবধূর কোমলতা ও অপরদিকে আধা রতিও বীরাঙ্গনার শৌর্য তেজ পাওয়া যাইতেছে,তখন সমালোচক মধুসূদনকে এই ভারতীয় ও অভারতীয় কয়েকটি বিখ্যাত প্রাচীর নারী- চরিত্রের আদর্শানুকরী ছাড়িয়া দিবেন এবং দুই বিভিন্ন আদর্শের নমুনাস্বরূপ প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সাহিত্য হইতে নারীচরিত্রের এক সুদীর্ঘ তালিকাও পেশ করিবেন।

কিন্তু একই নারী যদি কখনও কুলবধূ ও কখনও বীরাঙ্গনার ন্যায় আচরণ করে তবে কি তাহা বড়োই বিসদৃশ ঠেকে না? এমন একটি জোড়াতাড়া দেওয়ার কল্পনাটিই যে অপ্রাকৃত। অথচ মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্রকে যিনি অপ্রাকৃত বলিবেন, বুঝিতে হইবে তাঁহার এখনও রসবোধ জাগে নাই।

আসল কথা হইল,প্রমীলার মধ্যে আমরা দেশি-বিদেশি বহু প্রখ্যাত নারীচরিত্রের আভাস পাইতে পারি,কিন্তু সমন্বয়ের যাদু প্রভাবে প্রমিলা সকলের মধ্যে অনন্যা; তাহার মধ্যে অনেকে পাওয়া গেলেও, কাহারও মধ্যে তাহাকে পাওয়া যায় না। এ রহস্যের চাবিকাঠি হইল,- প্রমিলা কে আমরা যতই নূতন দেখি, এই চরিত্রের মূল উপাদান অভিনব নহে, একেবারে শাশ্বত নারীত্ব, এবং এই নারীত্বের বিচিত্র মণিখচিত স্বর্ণচূড়া যে একটি মাত্র স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাহা হইল, প্রেম। যে পতি- প্রেম ‘ নিকষিত হেম’, তাহা নারীকে অসাধ্যসাধনে সক্ষম করে; তাহারাই বিদ্যুদ্দীপ্তিতে আমরা নারীর কখনও কুলবধূ- রূপ কখনও- বা বীরাঙ্গনা- রূপ দেখিবার আশা করিতে পারি।


মোহিতলাল ঠিকই বলিয়াছেন, ‘ প্রমীলা বীরাঙ্গনাও নয়, লজ্জাশীল কুলবধূ ও নয়, সে। পতিগতপ্রানা প্রেমিকা নারী। সেই একই প্রেমের দায়ে সে কখনও বীরাঙ্গনা কখনও কুলবধূ’। অবশ্য একথা কেহই অস্বীকার করতে পারে না, যে, প্রমীলার বীরাঙ্গনা রূপ অধিকতর সমুজ্জ্বল হইয়া ফুটিয়াছে। কিন্তু সেই রূপের যতকিছু জ্যোতি, তাহার মূল উৎস হইল পতিপ্রেম; এই দৃষ্টিকোণ হইতে মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র বিচার না করিলে, মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এ বীররসের সঙ্গে শৃঙ্গার- রসের এক সংঘর্ষ বিচারককে বিভ্রান্তি করিয়া দিবার আশঙ্কা! কিন্তু কবি এই চরিত্রে আপাতদৃষ্টিতে যাহা একান্ত বিরোধী, সেই আদিরস ও বীররসকে একাধারে মিলাইয়াও রসভাস বা অসংগতি দোষ নিবারণ করিয়াছেন।

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র-এ মেঘনাদবধে কবির কল্পনাশক্তর সর্বোত্তম অভিব্যক্তি। যে যুগে মধুসূদন এই কাব্য রচনা করিয়াছিলেন, সেই যুগের কথা স্মরণ করিলে আমরা নিঃসংকোচে বলিতে পারি যে, প্রমীলার ন্যায় বীরাঙ্গনা চরিত্রের সৃষ্টি সত্যই বিস্ময়কর। “পৃথিবীর অনেক কবিরই কল্পনা বীররমণীর মহিমা বর্ণনা করতে উদ্দীপিত হইয়াছে; কিন্তু আপর কোনো কবিই এরূপ একটি চিত্র আঁকিতে পারেন নাই। ভার্জিলের ক্যামিলা (Camilla), ট্যাসোর ক্লরিড (Clorinda), গিল্ডিপ(Guildipe)ও এরমিনিয়া (Erminia) এবং বরণের মেড অফ সারাগোসা(Maid of Saragosa), সকলেই প্রমীলা হইতে স্বতন্ত্র ।

“ব্যাসের অতুলনীয় নারী- চরিত্রসৃষ্টি দ্রৌপদীর সঙ্গে প্রমীলার কিছুটা তুলনা হয়তো করা যাইতে পারে।”কুলবধূর কোমলতা, পতিপ্রনার আত্মবিসর্জন এবং বীরাঙ্গনার শৌর্য একসঙ্গে মিলিত হইয়া, মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্রকে সাহিত্য- জগতে অতুলনীয় করিয়াছে।”

মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এর উপাদান সম্পর্কে আরও কিছু বলা যাইতে পারে। যোগীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন, “ট্যাসোর ‘জেরুজালেম উদ্ধার’ কাব্যের বীরাঙ্গনা এরমিনিয়ার, ক্লবিন্ডার এবং গিল্ডিপের চিত্রে কবির বীরত্বানুরাগী হৃদয় আকৃষ্ট হইয়াছিল। তাহার পর ইলিয়াডের। রণসজ্জায় সজ্জিত এথেনীর (Athenae) এবং ইলিয়াডের অশ্বারোহণ-নিপুনা সহসঙ্গিনী কেমিলার চিত্র তাঁহার অস্পষ্ট কল্পনাকে আরও পরিস্ফুট করিয়াছিল।


সখী বাসন্তীর সহিত প্রমীলার কথোপকথনের মধ্যে তেজস্বিনী প্রমীলার কন্ঠে উচ্চারিত হইল:

“দানব- নন্দিনী আমি রক্ষ কুলবধূ
রাবণ শশুর মম মেঘনাথ স্বামী,
আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে?”

এখানে মনে পড়িয়া যায় আমাদেরJulius Caesar-এর Portia-র কথা:
A woman will-reputed ,-cato’s daughter
*. *. *. *
Being so fathered and so husbanded- ভাষণ -ভঙ্গি বুঝি একই। মাইকেলের প্রকাশভঙ্গি সত্যই অভিনব। এ ছাড়া, তাঁহার বাল্যের প্রিয় কবি কাশীরাম দাসের অশ্বমেধ পর্ব হইতে মধুসূদন তাঁহার মনঃ কল্পিতা নায়িকার একখানি রেখাচিত্র পাইয়াছিলেন।” “আরো একজন স্বদেশীও কবির নিকট মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র সম্বন্ধে মধুসূদন ঋণী আছেন। মেঘনাদবদ কাব্য প্রকাশিত হইবার তিন বৎসর পূর্বে, মধুসূদনের বাল্য সুদহৃদ, বাবু রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মিনী উপাখ্যান প্রকাশিত হয়।নিজের মনঃকল্পিত মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র কে পদ্মিনীর তেজস্বিতা, কোমলতা এবং পতিব্রত্যে ভূষিত করিয়া মধুসূদনের ইচ্ছা জন্মিয়াছিল।

রণসজ্জায় সজ্জিতা পদ্মিনীর সঙ্গে ভীমসিংহের সাক্ষাৎ এবং পদ্মিনীর চিতারোহণ পরিবর্তিত আকারে, তাঁহার মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র এর উপযোগী হইয়াছিল।”সর্বোপরি সমসাময়িক ইতিহাসও কবিকে কিছু উপাদান যোগাইয়াছে।মেঘনাদবধ বিরচিত হইবার মাত্র চার বৎসর পূর্বে ভারতের উপর দিয়ে এক প্রচণ্ড বিপ্লবস্রোত বহিয়া যায়- ইতিহাসে ইহার নাম সিপাহী বিদ্রোহ।

এই বিদ্রোহের নায়িকা ছিলেন ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ।”লক্ষ্মীবাঈয়ের বীরত্ব সমগ্র ভারতবাসীকে চমকিত করিয়াছিল, এবং যখন মধুসূদনের কল্পনায় প্রমীলার চিত্র প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল, তখনও লক্ষ্মীবাঈ ভারতবাসীদিগের আলোচনার বিষয় ছিলেন। স্ত্রীস্বাধীনতায় অনভ্যস্ত এবং বহুশত বৎসরের পরাধীন জাতির কল্পনা হইতে প্রমীলার ন্যায় বীরাঙ্গনার সৃষ্টি যে আকস্মিক কারণে হতে পারে না, তাহা বুঝাইবার জন্য আমরা এরূপ বিস্তৃতভাবে প্রমিলা চরিত্রের উৎস লইয়া আলোচনা করিলাম।


ট্যাসো, ভার্জিল, হোমর, কাশীরাম, রঙ্গলাল প্রভৃতির কল্পনা হইতে তিল তিল উপাদান সংগ্রহ পূর্বক দেবশিল্পীর ন্যায় মধুসূদন তাঁহার অমৃতময়ী প্রতিভার সঞ্চারদ্বারা এই তিলোত্তমার সৃষ্টি করিয়াছেন।”

(যোগীন্দ্রনাথ বসু)।বাল্মীকির মানসপ্রতিমা যদি হন তাহা হন সীতা, তাহা হইলে মধুসূদনের মানস প্রতিমা প্রমীলা (মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র)।

মেঘনাদবধ কাব্য
মর্ডান বুক এজেন্সি

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র

Spread the love

1 thought on “মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *