Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.

মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু পঞ্চম সর্গ ‘উদ্যোগ’

‘মেঘনাদবধ’ কাব্যের পঞ্চম সর্গের নাম কবি দিয়েছেন ‘উদ্যোগ’। এ সর্গে উপস্থাপিত ঘটনাবলীর পর্যালােচনা করলেই এ নামকরণের যাথার্থ্য নির্ধারণ করা যাবে। ‘মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গে দেখি প্রিয়ভ্রাতা বীরবাহুর মৃত্যুর পর বিপন্ন পিতার সমরসজ্জার সংবাদ পেয়ে প্রমােদকানন থেকে মেঘনাদ লঙ্কায় এসেছিলেন পিতাকে নিরস্ত

করে নিতে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য। দ্বিতীয় স্বর্গে দেখেছি তাঁকে নিধনের জন্য লক্ষ্মী, ইন্দ্র, পার্বতী প্রভৃতি উদ্যোগী হয়ে মহাদেবের কাছ থেকে মেঘনাদ হত্যার অনুমতি এবং উপায় জেনে নিয়েছেন; দেবাস্তু এসে পৌঁছেছে রামচন্দ্রের কাছে। তৃতীয় সর্গে প্রমােদকানন থেকে। প্রমীলা এসেছেন লঙ্কায় পতিসন্নিধানে। চতুর্থ সর্গে গল্প সরে গেছে সীতা-কথায়, বিশদরূপেজানা গেছে যুদ্ধের কারণ। পঞ্চম সর্গে বর্ণিত হয়েছে রাঘব এবং রাবণির পক্ষে যুদ্ধের উদ্যোগকথা। কবির উপস্থাপনানুযায়ী তা সংক্ষেপে এইরকম—

পঞ্চম সর্গের সময়-পট নিশীথ-রাত্রি, যখন : হাসে নিশি তারাময়ী ত্রিদশ আলয়ে। প্রথম সর্গে যে রাত্রির সূচনা, সেই রাত্রির আলম্বেই পরবর্তী চারটি সর্গের যাবতীয় ঘটনা ঘটে চলেছে। এখানে দেখা যাচ্ছে স্বর্গের সব দেবতারা ঘুমিয়ে পড়লেও বৈজয়ন্তধামে দেবরাজ ইন্দ্রের ঘুম আসছে না উৎকণ্ঠায়। স্ত্রী পৌলমীর অনুযােগে সে কথা ব্যক্ত করেন তিনি। পৌলমী তাঁকে প্রবােধ দেন, শিব তাঁর পক্ষে, দুর্লভ দেবাস্ত্র পেয়েছেন লক্ষ্মণ, পার্বতীও আশ্বাস দিয়েছেন, স্থির হয়েছে মেঘনাদ নিধনকর্মে স্বয়ং মহামায়া হবেন লক্ষ্মণের সহায়িকা, তবু এ উৎকণ্ঠা কেন! ইন্দ্র বলেন লক্ষ্মণ হস্তীতুল্যবীর, কিন্তু মেঘনাদ বীরসিংহ। তার তীরে বজ্র ব্যর্থ হয়, ঐরাবত দাঁড়াতে পারে না, কুলিশপাতনী দেবতাও অধীর হন তার হুঙ্কারে। ইন্দ্রাণী উদ্বিগ্ন হন ইন্দ্রের দুশ্চিন্তায়, উর্বশী-মেনকা-রম্ভারা দাঁড়ান কাছে এসে। বিনিদ্র এবং উদ্বিগ্ন এ অনন্ত নিমায় অকস্মাৎ মায়া এসে উপস্থিত হন বৈজয়ন্ত-ধামে। দেব পুরন্দরকে তিনি জানান যে তাঁরই ইচ্ছা পূরণ করতে তিনি চলেছেন লঙ্কায়, ভাের হতে আর দেরি নেই, ভাের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লঙ্কার পঙ্কজ-রবি’ চির-অস্ত যাবে; লক্ষ্মণ হত্যা করবে মেঘনাদকে। কিন্তু মেঘনাদ হত্যার সংবাদ পেলেই রাবণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে, তার ক্রোধ থেকে রাম, লক্ষ্মণ এবং বিভীষণকে কিভাবে রক্ষা করবেন দেবরাজের তা ভেবে দেখা দরকার।

ইন্দ্র বললেন, ইন্দ্রজিং মারা গেলে রাবণকে ভয় নেই, দেবকুল-প্রিয় রামকে রক্ষার জন্য দেবতারা যুদ্ধ করবে, এমন কি তিনি নিজেও যাবেন মতযুদ্ধে। মায়ার নিষ্ক্রমণের পর দেবরাজ ইন্দ্রজিৎ-নিধন সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে যান। স্বর্গদ্বারে পৌঁছে মায়া স্বপ্নদেবীকে পাঠিয়ে দেন মাতা সুমিত্রার বেশে লক্ষ্মণকে স্বপ্ন দিতে। সুমিত্রা-বেশিনী স্বপ্ন-দেবী গিয়ে মাথার কাছে বসে লক্ষ্মণকে ডেকে লঙ্কার উত্তর দুয়ারে বনরাজির মধ্যে সুন্দর সরােবরে স্নান করে, সংলগ্ন চণ্ডী মন্দিরে গিয়ে বিবিধ ফুলে দানবদলনী মায়ের পূজা করতে বলেন; বলেন, তাঁরই আশীবাদে সে মেঘনাদকে পরাজিত করবে; পূজা দিতে যেতে হবে একা।

স্বপ্ন মিলিয়ে গেলে ব্যাকুল চিত্ত লক্ষ্মণ অগ্রজকে জানালেন তার স্বপ্নের কথা। মায়াবীর দেশে সদাশঙ্কিত রাম স্বপ্ননির্দেশ পালন প্রসঙ্গে মিত্র বিভীষণের পরামর্শ জানতে চাইলেন। বিভীষণ জানালেন, সে সরােবর এবং চণ্ডীমন্দির মিথ্যা নয়, কিন্তু তা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর স্থান, সেখানে রাবণ ছাড়া আর কেউ পূজা করতে যায় না, শােনা যায় স্বয়ং মহাদেব সে-মন্দিরের প্রহরী, তবে সেখানে যে মাতৃপূজা করতে পারে জগতে সে অবশ্যই বিজয়ী হয়। লক্ষ্মণ যদি সাহস করে সেখানে যেতে পারেন তবে অবশ্যই তার মনােকামনা পূর্ণ হবে। রামের আদেশে সর্বকার্যে অকুতােভয় লক্ষ্মণ বিলম্ব না করেই যাত্রা করলেন। কাননে প্রবেশমুখেই তিনি দেখেন প্রহরারত মহাদেবকে। আত্মপরিচয় দিয়ে লক্ষ্মণ মহাদেবকে প্রণাম করেন এবং তাঁর আগমন হেতু জানান; প্রার্থনা করেন মহাদেব হয় তাকে চণ্ডীপুজার জন্যে কাননে প্রবেশ করতে দিন, নয় তাে যুদ্ধ করুন। মহাদেব তার সাহসের প্রশংসা করে তার প্রতি অভয়ার প্রসন্নতার কথা জানান, যুদ্ধ করেন না, নির্বিবাদে কাননে প্রবেশ করতে দেন। কাননে প্রবেশ করা মাত্রই মায়াসিংহ তেড়ে আসে লক্ষ্মণকে; রামের নাম করে অসি নিষ্কাষণ করা মাত্র সিংহ অদৃশ্য হয়ে যায়। তারপর, অকস্মাৎ দেখা দেয় ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তুমুল ঝড়, লঙ্কাকাপানাে সমুদ্র গর্জন, দাবানল। এসবও মায়া-পরীক্ষা, লক্ষ্মণের নিভকিতায়—একাগ্রতায় সবই দূর হয়ে যায় অচিরাতে। এরপর ফুল বনে প্রবেশ করা মাত্রই তিনি দেখেন অপূর্বক যৌবনা নারীকুল তীরে বস্ত্র খুলে রেখে সরােবরে মহানন্দে জলক্রীড়া করছেন। লক্ষণ সম্ভাষণ করে তারা জানালেন যে তাঁরা স্বর্গের অপ্সরা, পৃথিবীর মানুষ যুগ যুগ ধরে তপস করে স্বর্গের যে সুখভােগের আশায় এখনি তা তাঁরা দেবেন লক্ষ্মণকে যদি তিনি তাদের সঙ্গে যান। সুতনুকাদের এই মদির আহ্বানেও লক্ষ্মণ বিচলিত হন না, সংক্ষেপে তাদেরকে রাবণ কর্তৃক সীতাহরণ কাহিনী বিবৃত করে সীতা উদ্ধার কার্যে মাতৃজ্ঞানে তাদের আর্শীবাদ চান তিনি। এই প্রার্থনার সাথে সাথেই অদৃশ্য হয়ে যান অপ্সরারা।

এরপর লক্ষ্মণ দেখতে পান দেবী চণ্ডীর মন্দির। অবিলম্বে সরােবরে নেমে তিনি স্নান করেন, উঠে দেউল সরােবরসমস্ত চরাচর। এবং মন্দিরে এসে যথাবিধি সিংহবাহিনীর পূজা করেন। পূজা শেষে প্রার্থনা করেন মনোকামনা পূরণে অভয়ার বরাভয়। অমনি মেঘগর্জন হয়, বজ্রনাদে কেঁপে উঠে লঙ্কা, কেঁপে উঠে দেউল সরোবর সমস্ত চরাচর।

প্রচণ্ড তেজস্কর মূর্তিতে দেখা দেন অভয়া। সে জ্যোতিতে লক্ষ্মণের চর্মচক্ষু আঁধার হয়ে যায়, দিব্যচক্ষুতে দেবীকে দেখেন তিনি। আর্শীবাদ করে দেবী তাঁকে জানান যে শিবের আদেশে ইন্দ্র দেবাস্ত্র পাঠিয়েছেন এবং তার কার্যসফল করার জন্য নিজে এসেছেন মায়াদেবী। দেবাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে গিয়ে বাঘের মতাে অতর্কিত আক্রমণে মেঘনাদকে সে হত্যা করুক। দেবতাদের অসাধ্য কর্ম করে সে দেবতুল্য হবে।

অন্যদিকে, আসন্ন উযায় ঘুম ভাঙে মেঘনাদের। আদরে সােহাগে প্রিয়তমাকে জাগিয়ে দুজনে মাতা মন্দোদরীকে প্রণাম করতে যায়। সেখানে ত্রিজটা তাদের জানায়, পুত্রের মঙ্গল কামনায় মন্দোদরী সারারাত্রি শিবাৰ্চনায় রতা। মেঘনাদ ও প্রমীলা শিবমন্দিরে যায়। সেখানে মাকে প্রণাম করে সে নিকুম্ভিলা যজ্ঞশেষে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চায়, আর্শীবাদ চায় ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশােধ এবং লঙ্কাকে শত্রুমুক্ত করার জন্য।

মাতা মন্দোদরী রাম লক্ষ্মণের পরাক্রমে এবং বিভীষণের কৃতঘ্নতায় আতঙ্ক প্রকাশ করলে পুত্র তাকে আশ্বস্ত করে বলে—রাম-লক্ষ্মণকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই; এর আগেই দু’বার সে তাদের পরাজিত করেছে, তাত বিভীষণ জানেন তার পরাক্রম, জানেন ইন্দ্র ও মর্ত্যের বীরেরাও। তবুও মায়ের ভয় যায় না, তিনি শুনেছেন মায়াবী মানব এই রামচন্দ্র, মরে সে বেঁচে যায়, তার কথায় জলে পাথর ভাসে, বৃষ্টি হয় আকাশ থেকে। ইন্দ্রজিৎ মাকে প্রবােধ দেয়, ভয় নেই, দ্রুত ফিরে সে মাতৃপদ বন্দনা করবে। তখন মহাদেবের নামে পুত্রকে আর্শীবাদ করেন মন্দোদরী, আর প্রমীলাকে রেখে নেন নিজের কাছে। রথ ছেড়ে মেঘনাদ পদব্রজে এগিয়ে যায় যজ্ঞশালার দিকে। স্বামীর সঙ্গে যজ্ঞশালায় যাওয়ার, যাওয়া হল না, কিন্তু স্বামী যেন মনে রাখেন তিনি ছাড়া এ-দাসীর জগৎ অন্ধকার। মেঘনাদ তাকেও আশ্বাস দেয় অচিরাতে যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসার।

দূরে গমনপর মেঘনাদকে পেছন থেকে দেখে তার বীরমূর্তিতে গর্ববোধ করে প্রমীলা; তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে অভয়াকে প্রার্থনা করে মেঘনাদকে রক্ষা করার।

স্বর্গে প্রমীলার সে আরাধনা পৌঁছালে ইন্দ্র ভয় পেয়ে যান, বায়ু তাই দ্রুত সে পূজা দূরে উড়িয়ে দেন; নীচে বিরহিনী প্রমীলা সাশ্রু নয়নে ফিরে যায় শাশুড়ি-মাতার কাছে।

মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য – কৃষ্ণগোপাল রায়

আরো পড়তে পারেন

Spread the love