Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.

মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু চতুর্থ সর্গ ‘অশোকবন’

সৰ্গারম্ভে নমষ্ক্রিয়া ও আশীর্বাদ প্রার্থনাকে মহাকাব্যের অন্যতম শর্ত হিসাবে নির্ধারণ করেছিলেন বিশ্বনাথ কবিরাজ। চতুর্থ সর্গে সাহিত্যদর্পন’কারের এই শর্তটি মধুসূদন পালন করেছেন সহর্ষে। এর কারণ এ সর্গে তিনি সরাসরি অনুসরণ করেছেন বাল্মীকিকে। বাল্মীকিকে অনুসরণ করেই ভবভূতি রচনা করেছিলেন উত্তরচরিতম’ ও ‘বীরচরিত’ নাটক, ভর্তৃহরি রচনা করেছিলেন রামচরিতাত্মক ভট্টিকাব্য, কালিদাস লিখেছিলেন রঘুবংশম’ এবং বাংলায় কৃত্তিবাস রচনা করেছিলেন অনুবাদাত্বক রাম-পাঁচালি। কবির বিশ্বাস, বাল্মীকি দয়া না করলে এই সব কবিদের পাশাপাশি কাব্যবিশ্বে তিনি নূতন মালা গাঁথতে পারবেন না। লক্ষণীয়, এই বাল্মীকি-বন্দনায় পরােক্ষে কবি স্বীকার করে নিলেন যে এ-সর্গ রচনায় তিনি রসদ সংগ্রহ করবেন বাল্মীকি থেকেই। অর্থাৎ মাইকেল এখানে নিঃশেষে মগ্ন ভারতীয় ঐতিহ্যে। – সর্গটির নাম অশােকবন, এই নাম-শব্দটিও বাল্মীকিরই উদ্ভাবিত। কোন্ কথাবস্তুকে প্রতিফলিত করতে আদিকবি উদ্ভাবিত এ নামশব্দে সর্গের নামকরণ করলেন মধুসূদন এবং সে-নাম কতদূর শিল্প সার্থক হল, তা পর্যালােচনা করতে আমরা প্রথমে দেখে নেব এ সর্গে কথাবস্তুর সমায়ােজন।

আগামীকালের লঙ্কাযুদ্ধে মেঘনাদকে অভিষেক করা হয়েছে সৈনাপত্যে। লঙ্কাবাসীরা নিশ্চিত যে তার হাতে রাম-লক্ষ্মণের মৃত্যু হবে, শক্ররা ভয়ে পালাবে সমুদ্রপারে, বদ্ধদশায় রাজপদে নীত হবে বিভীষণ। পথে, ঘাটে, রাজদ্বারে, বাগানে, ঘরে, রাক্ষসেরা যে-যেখানে আছে সকলে এই আশায় আজ পুলকিত। আনন্দ সাগরে ভাসছে সারা লঙ্কা। শুধু অশােকবনে সীতা একা শােকাকুলা। প্রহরারত দুরন্ত চেড়ীরাও তাকে একা ছেড়ে দূরে গেছে উৎসব কৌতুকে। সীতা পড়ে আছেন হীনবল হারিণীর মতাে; তার জন্য মনস্তাপে বৃক্ষ ঝরাচ্ছে অজস্র ফুল, শাখায় শাখায় পাখীরা নীরব।

এমনি সময়ে সবার অলক্ষ্যে তার কাছে এসে উপস্থিত হলেন বিভীষণ-পত্নী সরমা। সীতার দুঃখে অশ্রুমােচন করে তিনি জানালেন চেড়ীদের দূরগমনের সুযােগে তিনি এসেছেন দেবী-পদবন্দনার আশায়, সঙ্গে কৌটোয় এনেছেন সিঁদুর। অনুমতি নিয়ে সে-সিদুর তিনি পরিয়ে দিয়েছেন সীতার কপালে: সধবা রমনী সীতাকে কি সিঁদুর ছাড়া মানায়! অতঃপর সরমা বসেছেন সীতার পদতলে; কবি উপমা দিয়েছেন এ যেন তুলসী তলায় প্রদীপ-জুলা।

সরমা এর আগেই সীতার কাছে তার সয়ম্বর কথা শুনে গিয়েছিলেন, আজ শুনতে চাইলেন তার অপহরণ-বৃত্তান্ত।

সীতা জানালেন- বৃক্ষচূড়ায় কপোত-কপোতীর সুখনীড়ের মতো গোদাবরী নদীর তীরে পঞ্চবটী বনে তারা বাসা বেঁধেছিলেন; সেখানে কোনাে অভাব ছিল না তাদের; ফলমূল সংগ্রহ করে আনতেন লক্ষ্মণ; মাঝে মাঝে মৃগয়া করতেন রামচন্দ্র।

—সীতা রাজকন্যা ও রাজবধূ, কিন্তু অরণ্য-জীবনে তিনি ভুলে ছিলেন রাজসুখ। বিচিত্রবর্ণ পাখিদের গান, ময়ূরের নৃত্য, হস্তীশাবকের অতিথ্য, হরিণ-শিশুর সঙ্গে খেলা, নবলতিকার বিয়ে দেওয়া, কখনাে স্বামীর সঙ্গে পরমানন্দে ভ্রমণ ও মধুর বিশ্রম্ভালাপে মগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে ঋষিপত্নীরা বেড়াতে আসতেন তার কাছে, বৃক্ষতলে হরিণচর্ম বিছিয়ে বসে তাদের সঙ্গে গল্প করতেন সীতা; কখনাে আবার পর্বত শিখরে স্বামীর পায়ের তলায় বসে তার কাছে শুনতেন আগম, পুরান, বেদ, পঞ্চতন্ত্রের কথা। পূর্ব-বৃত্তান্ত বর্ণনায় রামচন্দ্র প্রসঙ্গ আসলেই হয় সীতা বিষন্ন হয়ে পড়েছেন,অশ্রুপাত করেছেন, নয়তাে মূচ্ছা গিয়েছেন। সরমা অনুভব করেছেন তার মর্মবেদনা।

পঞ্চবটী বনে কিছুকাল সুখে কাটানাের পর একদিন আসে সূর্পনখা, সীতাকে মেরে রামচন্দ্রকে বিয়ে করতে চাইলে লক্ষ্মণ তাকে দূরে খেদিয়ে দেন; তখন রাক্ষসেরা তেড়ে আসে; ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়। সীতা জ্ঞান হারান যুদ্ধের ভয়াবহতায়, যুদ্ধশেষে রামচন্দ্র তাঁর চেতনা ফেরান। রামের কথা বলতে গিয়ে আবার জ্ঞান হারান সীতা, এবং জ্ঞান ফিরে এলে লজ্জিত সরমা ক্ষমা চান তাকে ক্লেশ দেওয়ার জন্য। সরমাকে প্রবােধ দিয়ে সীতা মারীচ। কি করে তাকে ছলনা করেছিল সেকথা শােনান। সােনার হরিণ সেজে এসেছিল মারীচ, সীতা সে সােনার হরিণ চাইলে লক্ষ্মণকে প্রহরায় রেখে রামচন্দ্র বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার আর্ত কণ্ঠস্বর শােনা যায়; সীতা লক্ষ্মণকে তাঁর সাহায্যে যেতে বললে লক্ষ্মণ। আপত্তি করেন মায়াবী দেশে সীতাকে একা রেখে যেতে। তখন আবার শােনা যায় রামের আর্ত কণ্ঠস্বর। এবার সীতা লক্ষ্মণকে ভ্ৎসনা করে নিজেই যেতে চাইলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও লক্ষ্মণ তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর করভ করভী ইত্যাদি নিত্য-অতিথির মধ্যে বৈশ্বানর-বেশী রাবণ এসে ভিক্ষা চায় সীতার কাছে। সীতা স্বামী-দেবরের প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে চাইলে ছদ্মবেশী রাবণ রঘুবংশের দোহাই পেড়ে, ব্রহ্মশাপের ভয় দেখিয়ে তাকে ভিক্ষাদ্রব্য নিয়ে কুটিরের বাইরে আসতে বাধ্য করে এবং তাকে হরণ করে। এ বিপত্তি কালে কেউ বাঁচতে আসেনা সীতাকে। বনদেবী শুধু অশ্রুপাত করেন। স্বমূর্তি ধারণ করে সীতাকে রথে তােলে রাবণ। নিরুপায় সীতা তার দেহের যাবতীয় অলঙ্কার ছড়াতে ছড়াতে যান পথে, যা দেখে রামচন্দ্র তাঁর গন্তব্যপথ জানতে পারবেন।

আকাশ, বাতাস, মেঘ, ভ্রমর, কোকিল-সবাইকে সীতা অনুরােধ করেন তার বিপত্তির কথা রাম-লক্ষ্মণের কাছে পৌছে দিতে। আর বন, পাহার, নদ-নদী, জনপদ পার হয়ে ছুটে চলে রাবণের রথ।

অনেকক্ষণ পর একটা পাহাড়ের উপর থেকে এক বীর রাবণকে প্রতিহত করে দাঁড়ায়। তারপর দুজনের মধ্যে বেধে যায় তুমুল যুদ্ধ। সে যুদ্ধের ভয়বহতায় জ্ঞান হারান সীতা। জ্ঞান ফিরলে রথ থেকে নেমে তিনি পালাতে চান জঙ্গলে বা দুরদেশে, কিন্তু পারেন না, পৃথিবী তখন টলমল। ভূতলে পড়ে তিনি আবার জ্ঞান হারান। এবার লুপ্ত-জ্ঞানের ভিতরে তিনি স্বপ্ন দেখেন; দেখেন, জননী বসুমতী এসে তাকে বলছেন—বিধির ইচ্ছাতেই রাবণ চুরি করছে তাঁকে, এই পাপেই সে সবংশে মরবে, তার পাপের ভার তিনি (বসুমতী) আর বহন করতে পারছেন না; রাবণকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতেই তিনি সীতাকে জন্ম দিয়েছেন, সীতা-আজ জননীর জ্বালা দূর করল। এই বলে বসুমতী সীতার সামনে খুলে ধরেন ভবিতব্য-দ্বার।

সীতা দেখেন একটা পাহাড়ে অপেক্ষারত পাঁচজন বীরের দ্বারা বন্দিত হয়ে রামচন্দ্র এক সুন্দর নগরীতে যান ভিতর সর্বশ্রেষ্ঠকে রাজা করেন। তারপর অসংখ্য বীর মিলে মত্ত হয় কোনাে উদ্যোগে। মাতা বসুমতী তাকে বুঝিয়ে দেন, রাজা হলেন সুগ্রীব, মারা গেলেন বালী এবং ঐ উদ্যোগ সীতাকেই খোঁজার জন্য।

সীতা আরাে দেখলেন সাগরে শিলা ভাসিয়ে, সেতু নির্মান করে, রামচন্দ্রের জয়ধ্বনি দিতে-দিতে বিপুল বাহিনী এসে পৌছালাে লঙ্কায়। এদিকে লঙ্কার রাজসভায় একজন বীর তাকে (সীতাকে) রামচন্দ্রের হাতে ফিরিয়ে দেবার পরামর্শ দিয়ে ধিকৃত হলেন। রাবণ পদাঘাত করল তাকে। সরমা বুঝতে পারেন ইনিই তার স্বামী বিভীষণ। বিভীষণ যে তার সঙ্গে নিরালায় সীতার জন্য কত কেঁদেছেন, সুযােগমত সরমা সেকথা জানান সীতাকে।

স্বপ্নে লঙ্কায় সৈন্য সজ্জা দেখলেন সীতা, দেখলেন রাজসভায় বসে বিষগ্ন রাবণকে। রাবণ নির্দেশ দিল কুম্ভকর্ণকে যুদ্ধে পাঠাতে, যুদ্ধে গিয়ে কুম্ভকর্ণ নিহত হলেন রামচন্দ্রের তীরে। হােক শত্রু, তবু মৃত পীড়া দেয় সীতাকে। কিন্তু বসুমতী বলেন, তিনি যা দেখলেন সব সত্য হবে।

এরপর সীতা দেখেন দেবকন্যারা স্বর্গীয় আভরণ নিয়ে তাকে সাজাতে আসছেন, রামচন্দ্রের হাতে তারা তাকে সমর্পন করবেন। সীতা প্রথমে সাজাতে রাজী না হলেও তাদের উপরােধে সুসজ্জিত হয়ে নিকটেই স্বামীকে দেখতে পান এবং যেই তাকে ধরতে যাবেন অমনি ফিরে আসে তার চেতনা। তার জন্য আক্ষেপ করলে সীতাকে সরমা আশ্বাস দেন যে আচিরাতে স্বামীকে বাস্তবে তিনি ফিরে পাবেন। |

স্বপ্নভঙ্গের পর চেতনা ফিরে পেয়ে সীতা দেখেন সেই বীরকে পরাজিত করে রাবণ আস্ফালন করছে। তারই আস্ফালন থেকে তিনি জানতে পারেন সীতার জন্য যিনি প্রাণ দিলেন তিনি গরুড়পুত্র জটায়ু। জটায়ু রাবণকে সর্তক করে বললেন এই নারীকে হরণ করে সে বিপদে পড়ল। সীতা তাকে নিজের পরিচয় দিয়ে রামচন্দ্রের দেখা পেলে সব সংবাদ দিতে অনুরােধ করেন। রাবণ আবার সীতাকে রথে তােলে এবং আকাশপথে রথ উড়িয়ে লঙ্কায় নিয়ে আসে। সেই থেকে তিনি বন্দিনী।

সীতাকে আশু সুভবিষ্যতের আশ্বাস দেন সরমা, সুখের দিনে তাকে ভুলে না যাওয়ার অনুরােধ করেন, অন্যদিকে তিনি জানান যে সীতার মূর্তি মনে-মনে তিনি চিরকাল পূজা করবেন। সীতা বলেন, লঙ্কায় সরমা তাঁর পক্ষে মরভূমিতে নদী, মহাই আদরের।

এরপর সরমা সীতাকে প্রণাম করে বিদায় চান, সীতাও চেড়ীদের পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে তাড়াতাড়ি বিদায় দেন তাঁকে। তাঁর প্রস্থানের পর অরণ্যের নিঃসঙ্গ কুসুমের মতাে অশােকবনে বসে থাকেন সীতা। চতুর্থ সর্গের এই হল কথাবস্তু।

যুদ্ধ-মুখর মহাকাব্যে চতুর্থ সর্গ বাড়িয়ে ধরেছে প্রশান্তি, কাজ করেছে নাটকীয় বিশ্রামের মতাে, আবার সীতার অতীতচারিতা ও স্বপ্নদর্শনে মাত্র আড়াই দিনের ঘটনা নিয়ে লেখা এ কাব্যে ধরা দিয়েছে বিরাট কালের প্রলম্ব, মহাকাব্য হওয়ার পক্ষে যা তার জরুরি ছিল। এ সর্গের দারুণ উপযােগিতা এইখানে।

প্রত্যক্ষ ঘটনা এ-সর্গে যৎসামান্য, সীতার স্মৃতিচারণা এবং স্বপ্নদর্শনের মধ্যেই যা-কিছু বড় ঘটনার বর্ণনা। শান্ত, করুণ, লাঞ্ছিতা ও দীর্ঘকাল স্বামীসঙ্গ-বঞ্চিতা দুই নারীর প্রাণবেদনার নিভৃত আলাপন এই সর্গ। একটি বিশেষ বিন্দুতেই আগাগােড়া স্থির এই আলাপন—ক্ষেত্রটি। অশােকবন। তাই অশােকবনের নামে এ সর্গের নামকরণ করেছেন মাইকেল। ঘটনার স্থান পটভূমির নামানুসরণে সৃজনমূলক কোনাে রচনার নামকরণ শিল্পসঙ্গত; সুতরাং মেঘনাদ বধ কাব্যের চতুর্থ সর্গের নামকরণকে অসঙ্গত বলার কোনাে অবকাশ নাই।

মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য – কৃষ্ণগোপাল রায়

আরো পড়তে পারেন

Spread the love

8 thoughts on “মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু চতুর্থ সর্গ ‘অশোকবন’”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ 'অভিষেক'

  2. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু দ্বিতীয় সর্গ 'অস্ত্রলাভ'

  3. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু সপ্তম সর্গ ‘শক্তিনির্ভেদ’ - Debota Hembram

  4. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু অষ্টম সর্গ ‘প্রেতপুরী’ - Debota Hembram

  5. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ ‘সমাগম’ - Debota Hembram

  6. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র – Debota Hembram

  7. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু তৃতীয় সর্গ ‘সমাগম’ – Debota Hembram

  8. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ সর্গ ‘বধ’ » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *