প্রমীলা চরিত্র

মধুসূদনের প্রমীলা চরিত্রটি নবযুগের নব সাহিত্যের সূচনার পরিচয়

মধুসূদনের প্রমীলা চরিত্রটি নবযুগের নব সাহিত্যের সূচনার পরিচয়

অন্তঃপুরে কুলবধূকে বহির্বিশ্বের বীরাঙ্গনাররূপে চিত্রিত করে মধুসূদন প্রমীলা চরিত্রে নূতনতর প্রাণধর্ম আরোপ করিয়াছেন।নবযুগের নবসাহিত্যের অবলম্বন এই প্রাণধর্ম। প্রকৃতপক্ষে মধুসূদনের যে সর্বাতিশায়ী কল্পনা মেঘনাদবধ কাব্যের রচনা আর মূলে রহিয়াছে, তাহাই এই চরিত্রটিকে বিশিষ্টরূপে মন্ডিত করিয়েছে। মধুসূদনের কাব্যাত্মাই ইহার মধ্যে সঞ্চারিত হইয়া ইহা কে প্রাণবান কোরিয়া তুলিয়াছে।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র

ঊনবিংশ শতকের প্রথম যুগের অদ্বিতীয় প্রাণধর্মী পুরুষ ছিলেন মধুসূদন। প্রমীলা চরিত্র পরিকল্পনার ভিতর দিয়া সেই প্রাণ ধর্মকে তিনি জাতির সাহিত্যে সঞ্চারিত করতে চাহিয়াছেন।

বীর্যবতী নারী প্রমিলা, অথচ তাহার চরিত্রের কোমলতা, মৃদুতা বাঙ্গালী গৃহস্থের কুলো বধুর কথাই স্মরন করাইয়া দেয়।

শাশুড়ির অনুরোধকে লঙ্ঘন না করার মধ্যে রহিয়াছে একটি শান্ত স্নিগ্ধ কোমলতা। কিন্তু গৃহস্থ বধূর এই সংকোচ ও স্নিগ্ধতায় প্রমীলা চরিত্রের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নহে-এ চরিত্রের মূল কথা তো নহেই। তাহার বীরসজ্জায় লজ্জাবতী গৃহবধূকে বহু পাশ্চাতে ফেলিয়া আসিয়া সে একটি রোমান্টিক ভাববিলাসের উপজীব্য হইয়া উঠিয়াছে।

আরো পড়তে পারেন:মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’

মধুসূদনের প্রতিভা প্রমীলার চারিদিকে নিছক প্রেমগুঞ্জনের একটা পরিবেশ রচনা করিতে চাহে নাই; তাহা বীরোচিত মর্যাদা কে বরণ করিয়া তাহাকে কাব্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছে। প্রমীলার মধ্যে এই কুলবধূ ও বীরাঙ্গনার দুইটি আপাতবিরোধী মূর্তি প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতে এই কথাই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে,

“প্রমীলা বীরাঙ্গনাও নয়, লজ্জাশীলা কুলবধূও নয়-সে পতিগতপ্রানা নারী। সেই একই প্রেমের দায়ে সে কখনও বীরাঙ্গনা, কখনও কুলবধূ, নতুবা তাহার আসল রূপ একই। যে সর্বাতি- শায়ী নারীপ্রেম কোমলকান্ত রূপ ধারণ করিয়া গৃহকোণকে দীপ্তিদান করে, আবার প্রয়োজন হইলে বহ্নিশিখায় জ্বলিয়া উঠিয়া বিশ্বভুবনকে আলোকে উদ্ভাসিত করে, মধুসূদন প্রমিলা-চরিত্রের মধ্যে তাহাকেই রূপ দান করিয়াছেন।”

মধুসূদন নারী-প্রেমের এক কামনা-বলিষ্ঠ আদর্শকে বরণ করিয়া প্রমিলা-চরিত্রে নারীর প্রেমকে এক নূতন আদর্শে উদ্বোধিত করিয়াছেন-সেই আদর্শকেই বুঝিয়া লইতে হইবে, নতুবা এ চরিত্র-সৃষ্টির রহস্য হৃদয়ঙ্গম হইবে না।

প্রমীলার নারীত্বে কবি সেই প্রেমকেই একাধিপত্য দিয়েছেন, যে প্রেম নারীকে দুর্জয়শক্তির অধিকারিণী করে, যে প্রেম আপনার মধ্যে আপন বাসনাকে রুদ্ধ করিয়া একটা আত্মিক আনন্দেই চরিতার্থ হয় না।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ সর্গ ‘বধ’

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রমীলা চরিত্র সৃষ্টির দিকে ইঙ্গিত করিয়া মোহিতলাল এই চরিত্রের দ্বৈধী সম্বন্ধে বলিয়াছেন:

‘‘প্রমীলার চরিত্রের স্বাধীন-ভতৃকা নায়িকার সঙ্গে বাঙালী কুলবধূ এবং ভারতীয় আদর্শের শক্তিরূপা নারীর সঙ্গে অভারতীয় বীরাঙ্গণামূর্তির এই যে সমন্বয়, ইহারই প্রতিভা সে যুগের বাংলা সাহিত্যকে উদ্ধার করিয়া ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলিতে যে সমন্বয়, ইহারই প্রতিভা সে যুগের বাংলা সাহিত্যকে উদ্ধার করিয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলিতে যে প্রতিভা ইউরোপীয় ভাববস্তুকে দেশীয় বিগ্রহরূপে যেমন রূপান্তরিত করিয়াছিল, এখানেও সেই কীর্তিকুশলতা লক্ষ্য করা যায়। এমনই করিয়া সে যুগের কবি প্রতিভার এই আত্মসাৎ বা স্বীকরণ শক্তির গুণে আমাদের সাহিত্য প্রাণ পাইয়াছিল। কিন্তু প্রমীলার চরিত্র-সৃষ্টিতে মধুসূদনের দুঃসাহস বিস্ময়কর। দুই সম্পূর্ণ বিরোধী সংস্কারকে তিনি এই চরিত্রে যুক্ত করিয়াছেন -সে বিরোধ এমনই অসংশয় যে কবির সৃষ্টিতে এইরূপ চাক্ষুষ জীবন্ত দৃষ্টান্ত ছাড়া, কোনো প্রকারে, তাহাকে মন হইতে দূর করা যায় না! প্রমীলার চরিত্রে কবি আমাদের দেশের মূক দাম্পত্য-প্রেমকে যে মুখরতা দান করিয়াছেন, এবং তাহারই যে দুঃসাহস, তাহাতেই নবযুগের নবসাহিত্যের সূচনা হইয়াছে।”

আরো দেখতে পারেন: মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাংলা বই পিডিএফ ডাউনলোড

এক কথায়, প্রমীলা বাংলার আধুনিক কথা ও কাব্য কাব্য-সাহিত্যের নারী চরিত্রের নব নব আদর্শের উৎসস্বরূপ।

মেঘনাদবধ কাব্য
মর্ডান বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড

Spread the love

1 thought on “মধুসূদনের প্রমীলা চরিত্রটি নবযুগের নব সাহিত্যের সূচনার পরিচয়”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *