Our website is made possible by displaying online advertisements to our visitors. Please consider supporting us by whitelisting our website.

বিনতী । সাঁওতাল সমাজের সাহিত্য

বিনৰ্তী সাঁওতাল সমাজের মূল্যবান মৌখিক সাহিত্য। যুগ যুগ ধরে এই সাহিত্যকে তারা যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করে রেখেছে, তবে মুখে মুখে প্রচলিত থাকায় এই মূল্যবান সাহিত্যের আদিরূপ অবিকল পর্বের মত আর ধরা পড়ে না। তাই বিভিন্ন অঞ্চলের প্রচলিত বিনৰ্তীর মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য লক্ষ্য হয়। সময়, কাল ও স্থানীয় অঞ্চলের প্রভাব পড়ায় এ সব বিনৰ্তীর  এখানে-ওখানে কিছু কিছু
যােগ-বিয়ােগ নিশ্চিত হয়েছে, তবুও বলা যায় যে, মূল বিষয়টি আজও অপরিবর্তিতই আছে। এই মৌখিক সাহিত্য তাদের কাছে অতি প্রিয় এবং সমাজ জীবনে এর স্থান কম নয়।

স্পষ্টত মানব সমাজের লোকসংস্কৃতি ধারা প্রায় অভিন্ন। বাংলা ভাষায় যে কথাবার্তা ও চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার শ্রোতাদের মনের কথা সবিস্তারে গানে ও বচনে প্রচারিত, বিনতি অনেকটা সেই প্রকার। ধর্ম ও সাহিত্যের সমমিশ্রণ।
বিনতি’তে সষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঘটনা, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয় ইত্যাদি স্তব-স্তুতি সহকারে স্মরণ করা বা তুলে ধরা হয়। তুলে ধরেন বিনৰ্তীকার বা বিনতী গুরু বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে এবং বালক-বালিকা, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই মন দিয়ে তা শােনে। কারণ, এই শ্রুতিকথার মধ্যেই যেমন সাঁওতাল সমাজের আদি ইতিহাস আছে, তেমনি কাব্যরস আছে। প্রয়োজন হলে বিনতিকার বিনতীটিকে শ্রোতাদের কাছে আরাে উপভােগ্য করে তােলার জন্য কোন-কোন অংশ গানের মাধ্যমে তুলে ধরেন এবং ব্যাখ্যা করেন।
সাঁওতালীতে চারটি বিনৰ্তী শুনতে পাওয়া যায়-(১) জম সিম বিনতি (২) ছৗটিয়ার বিনৰ্তী (৩) ভান্ডান বিন্তি এবং (৪) কারাম বিনৰ্তী। এছাড়া, বিবাহ অনুষ্ঠানের আচার-বিধান সম্পর্কে যদিও এক সময়ে ‘বাপলা বিনৰ্তী’  সমাজে প্রচলিত ছিল, কিন্তু সেদিন নানা কাজকর্মের চাপে সময় হয় না বলে বর্তমানে তা আর শোনা যায় না। তার প্রচলনও তাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিনৰ্তী তাদের কাছে কিন্তু বানানাে গল্প, কাহিনী নয়—এগুলাের সঙ্গে তাদের সমাজের সত্যিকারের ইতিহাস বিজড়িত। নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা কি ভাবে বিভিন্ন জায়গা পরিভ্রমণ করেছে, কিভাবে তাদের রীতি-নীতি, নিয়ম-কানুন তৈরি হয়েছে এবং ক্রমে একটি জাতি গোষ্ঠীকে পরিণত হয়েছে, তার আভাস এই বিনৰ্তীগুলাের মধ্যে তুলে ধরা হয়েছে। মােট কথা সাঁওতাল সমাজের ঐতিহ্য এই বিনৰ্তীগুলির সঙ্গে বিজড়িত। আমরা জানি, মানুষের জীবনে জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু লিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-পড়শী সবাই এ সময়ে বিনৰ্তীগুলিকে পরিবেশন করে সেগুলিকে পুনর্বার স্মরণে আনে, সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে।
বিনৰ্তী বলার সময়ে বিনৰ্তীকার বিভিন্ন ভাবে শ্রোতাদের সম্বোধন করে থাকেন। কারাম বিন্তি বলার সময় ‘বাবা’ বলে, ছৗটিয়ার বিনৰ্তীর সময় ‘সাহেব বলে এবং ভাণ্ডার বিনৰ্তী সময় ‘বাপধন’ বলে বিনৰ্তীর আসরে বিনৰ্তীকারক শ্রোতাদের সম্বোধন করে থাকেন। জমসিম বিনৰ্তীর  সময়ে কিন্তু তা দেখা যায় না। বলতে বাধা নেই এ সব বিনৰ্তী সাঁওতাল সমাজে বাংলা মঙ্গলকাব্যের মতই সমাদর পায়। মনে হয়, ভাগবত-রামায়ণ-মহাভারত পাঠের মতে এগুলো শ্রদ্ধা সহকারে শুনতে হয়।
সাঁওতালী ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস, ধীরেন্দ্র নাথ বাস্কে, বাস্কে পাবলিকেশন ও সুবর্ণরেখা, কলকাতা, ২০১৬, পৃ.১২৭-১২৮
প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে বিনতী বানানে ‘ন্’ লেখা সম্ভব হয়ে উঠল না।
পোস্টটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। কোন পরামর্শ থাকলে অবশ্যই জানাবেন।

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *