জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্র

জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্র

জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্র

 

সরকারী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সৎ ও আদর্শবান, গান্ধীবাদে অবিচল সংসার সম্পর্কে উদাসীন, দেশ- প্রেমিক, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে রাজনীতি বিশ্লেষক, ভগবানে বিশ্বাসী বাবা উপন্যাসের শেষে এক স্নেহময় পিতা। সতীনাথ পিতা ইন্দুভূষণ, পূর্ণিয়া কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা গোকুলকৃষ্ণ রায় ও সর্বোপরি পুরুলিয়ার ঋষিতুল্য হেডমাস্টারমশাই শ্রী নিবারণচন্দ্র দাশগুপ্তের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আলোচ্য জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন। চরিত্রটির মধ্যে তিনটি সত্তা পরিষ্কার ধরা পড়ে–

১. রাজনৈতিক সত্তা
২. পিতৃসত্তা
৩. অখন্ড মানস সত্তা

তিনটি সত্তা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গোটা জাগরী উপন্যাসের বাবার রাজনৈতিক সত্তাটি বেশি প্রাধান্য পেলেও উপন্যাসের শেষে তিনি পরিবার- জীবন ও পিতৃ ভাবনায় কাতর হয়েছেন। বোঝা যায় বাইরের রাজনৈতিক কর্ম ও পরিবার সম্পর্কে উদাসীনতার অন্তরালে এক আত্মীয়তা বোধ বাবার সর্ব সত্তায় বিরাজিত । কেননা যে দলের হয়ে তিনি প্রাণপাত করেছেন, সেই দলের মধ্যেই দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে।

সোশালিস্ট ও কমিউনিস্ট দলের অনেক ভালো গুণ তার দলে (কংগ্রেস ) অনুপস্থিত ।সংসারের কর্তা হয়েও তিনি সংসারের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সচ্ছলতা দিতে পারেননি। তাই জাগরী উপন্যাসের বাবার কন্ঠে হতাশা ও বিষাদের সুর। দিলুর ফাঁসীর রাতে অসহায়, নিরুপায়, যন্ত্রণাকাতর এক পরিবারের কর্তা ও পিতাকে আমরা দেখতে পাই। বিষয়টি গভীর বিশ্লেষণে দাবী রাখে।

জাতীয় পতাকা কে নমস্কার জানিয়ে বাবার আত্মকথন শুরু হয় এবং জোর ভজনের মাধ্যমে তার আত্মকথন শেষ হয় । মধ্যের ৩৮-৪০ পৃষ্ঠায় বিন্যস্ত বাবার চিন্তার স্রোতের মধ্যে রাজনীতিরই প্রাধান্য। গান্ধীবাদী জাগরী উপন্যাসের বাবা কংগ্রেসের অন্যতম নেতা। ১৯২০-২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪২ অর্থাৎ দীর্ঘ ২০-২২ বছরের কংগ্রেসী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বাবা নিজের জীবন -মন সমর্পণ করে দেশের সেবা করেছেন।

পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে গড়ে ওঠা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি তাঁর অহি-নকুল সম্পর্ক নয় –শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সম্পর্ক। তাই আপার ডিভিশন ওয়ার্ডের ভিতরে কীর্তন ও গানের ব্যাপারে সোশালিস্ট ও কমিউনিস্ট যুবকদের বিরক্তির জন্য তিনি সন্ধ্যার আগেই প্রার্থনার কাজ সেরে নেন। এতে কংগ্রেসের অনেকের অমত থাকায় তিনি তাদের বোঝান–

“তোমাদের আদর্শ মহাত্মাজীর দেখানো পথ। তাহা কত উচ্চে। তাহা হইতে বিচ্যুত হইবে কেন?” (পৃঃ-৫৬)

উদার ও মহৎ হৃদয় মাস্টার সাহেব আরো বলেন–

 

“… বিলুও তো ওই দলের মেম্বার –ওদের প্রত্যেকটি ছেলে যে আমার কাছে বিলুর মতো…” (পৃঃ ৫৬)

 

ফাঁসীর আগের রাত বাবা পুত্র বিলুর সঙ্গে কাটাতে চান।বিলুর কথা ভাবতে গিয়ে তাঁর চরিত্রের কোমল ও কঠোর রূপই বাবার চেতনাতে প্রতিভাত হয়–

বিলুর কোমল রূপ —

 

“আমার সম্মুখে আসিলেই বিলু দেখি সঙ্কুচিত হইয়া যায়,কেমন যেন জড়সড় ভাব।…”(পৃঃ_৫৬)

বিলুর কঠোর রূপ–

” যে বিলু আমার মুখের দিকে তাকাইতে পারে না, তাহার চোখে দেখিয়াছিলাম সুপ্ত পৌরুষের ব্যঞ্জনা। আমার দিকে তাকাইল, যেন চোখ দুইটি হইতে আগুনের ফুলকি ছিটকাইয়া পড়িল।”( পৃঃ_৬৩)

 

নিলু সম্পর্কে বাবা ভাবেন–

“…নিলু তো আমার প্রাণে আঘাত দিবার সুযোগ পাইলে ছাড়ে না।…” (পৃঃ ৭৮)

 

রাজনীতির ময়দানে নেমে জাগরী উপন্যাসের বাবা সর্বক্ষণ কংগ্রেসের কাজে ব্যস্ত থাকেন। সংসার, স্ত্রী-পুত্রের দিকে ফিরে তাকানোর সময় পান না । মা তাই অনুযোগ করে বলেন–

“নিজের ছেলের দিকেও একটু ফিরে তাকিও।”(পৃঃ-৫৭)

নিজের স্ত্রীর সঙ্গেও বাবার সম্পর্ক স্বাভাবিক ভাবে আর পাঁচটা স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। নারীত্বের ও পত্নিত্বের প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত মা তাই ভাবেন–

“…. ওঁর সঙ্গে কি কোনদিন প্রাণ খুলে কথা বলতে
পেরেছি ?মন খুলে কথা বলব কী ভয়েই মরি।
আমাদের তো ঠিক অন্য সবার মতো নয়।” (পৃঃ ১১৫)

মা যেন বাবাকে ভয় করে চলেন, বিলু- নিলু দুই ভাইও তাই ।বাবার সঙ্গে ছেলেদের সম্পর্ক স্নেহ- ভালবাসার পরিবর্তে ভয় -সমীহের। স্কুল মাস্টার বাবা পরিবার- রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই ছাত্র- শিক্ষক বা গুরু -শিষ্য সম্পর্কের কথা ভাবেন–

“ছিলাম স্কুল মাস্টার। অভ্যাস দোষেই হউক বা
অন্য কোনও কারণেই হউক, পৃথিবীর সকল
ক্ষেত্রেই এই শিক্ষক ছাত্রের সম্বন্ধে দেখিতে
পাইয়াছি ।সেই জন্য রাজনীতি ক্ষেত্রেও বুড়োকে
গুরু বলিয়া মনে করি; ছোটকে শিষ্যের দৃষ্টিতে
দেখি।…..(পৃঃ-৫৬)

জাগরী উপন্যাসের বাবা গান্ধীজীর মতো সোমবারে আত্মশুদ্ধি করেন, সন্ধ্যার সময় প্রার্থনা করেন, মহিষের দুধ বা ঘি কোনটাই খান না। সাত্ত্বিক টাইপের এই মানুষটি স্নায়ুর উত্তেজনা কমাতে চরখা কাটেন। আবার তিনি কষ্টসহিষ্ণু। জপের সময় একাগ্রতার জন্য মশারি ব্যবহার করলেও রাতে শোয়ার সময় মশারি ব্যবহার করেন না। তার কথায়–

“মশার কামড় সহ্য করিবার মত সহিষ্ণুতা যদি না
থাকে, এতটুকু কৃচ্ছ সাধন করিবার ক্ষমতা যদি
না থাকে, তাহা হইলে বড়ো কাজ আমাদের দ্বারা
কী করিয়া হইবে?(পৃঃ-৫৭)

বাবা চরখায় সুতো কাটার মাধ্যমে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন ।গ্রামীণ ভারত গড়ার রূপরেখা তৈরি হয় তাঁর ভাবনায় এভাবে–

“… রামরাজ্য হইবে প্রেমের রাজ্য, গৌরাঙ্গের রাজ্য;
লোকে হিংসা-দ্বেষ ভুলিবে ।পরিশ্রম করো; সুখে
খাওদাও, থাকো, কাহারও অভাব নাই। প্রত্যেকের
গোয়ালে গরু, মরাইয়ে ধান। যত গজ সুতা কাটিবে
ততটা লক্ষ্যের নিকট পৌঁছিবে।…. (পৃঃ-৬০)

আদর্শনিষ্ঠ বাবার চিন্তায় সাম্য -শান্তি -সুস্থিতির প্রতিচ্ছবি ।শুধু তিনি নন, জেলের ভিতর সংখ্যাগরিষ্ঠ, বয়স্ক ও ঈশ্বরবিশ্বাসী কংগ্রেসকর্মীদের মধ্যেই এই ভাবনার প্রতিফলন লক্ষিত হয়। সদাশিউ ও মেহেরচন্দ সর্বদা মাস্টারসাহেবকে নানা দিক হতে সেবা-যত্ন করেন। দলের অন্যান্যরাও বাবাকে সমীহ করে চলেন।

কিন্তু জাগরী উপন্যাসের বাবা তাদের দলের নীতি আদর্শ দিয়ে নতুন প্রজন্মের যুবকদেরকে ধরে রাখতে পারেননি। নিজের ছেলে বিলুও নীলুকেও না। বাবার ভাবনায় তা এভাবে ধরা পড়ে–

“দলে দলে রাজনৈতিক কর্মীরা আমাদের মত
ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছে। বোঝো না-বোঝো,
মানো না মানো সোস্যালিস্ট হওয়া তো একটি
ফ্যাশন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নিলু বিলুর কথাই
ধরো না। এই তো১৯৩০-৩২-এ কত চরকা কাটা;
কত রকমের কথা। এমনভাবে উহারা গড়িয়া
উঠিয়াছিল যে আমি কোনওদিন ভাবি নাই, যে
এই উচ্চ আদর্শ উহারা কোনদিন ছাড়িতে পারিবে।”
(পৃষ্ঠা-৬০)

এখানেই জাতীয়তাবাদী ও দেশভক্ত বাবা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন–

“নিজের দেশের বেদ পুরান মুনি ঋষি, ইতিহাস
সব গেল –সকলের নজর রুষের উপর। আরে,
রুশ কি নিজের দেশের চাইতে উঁচুতে?…ম্যাটসিনি,
গ্যারিবন্ডি, ওয়াশিংটন, কোসুথের অমর কাহিনী
আমাদেরও রোমাঞ্চ আনিয়া দিত।… কিন্তু তাই
বলিয়া শিবাজীর গৌরবকথা ভুলিয়া যায় নাই।…
মহাত্মাজী অপেক্ষা স্টালিনকে বড় বলিয়া মনে
করিতে পারি নাই।” (পৃঃ-৬০)

 

বিলু নীলুর সোস্যালিস্ট পার্টিতে যোগদান আটকানোর জন্য তিনি পিতা হিসাবে নিজের দায়িত্ব -কর্তব্য করেননি বলে ভাবেন। পরক্ষণে আত্ম-সমালোচনার মাধ্যমে মনে করেন আমিও তো কারো কথা না শুনে স্কুল মাস্টারি ছেড়ে কংগ্রেসের কাজে যোগ দিই। তাহলে বিলু কেন তার কথা শুনবে ! আত্ম- আত্মজের মধ্যে এহেন মনোসমীক্ষণ জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্রটিকে উজ্জ্বল করে তুলেছে ।

বাবা নিঃস্বার্থভাবে দেশসেবা করেছেন। নিজের পরিবারের আর্থিক অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও তিনি কংগ্রেসের কাজে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে উজাড় করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে বাবা বলেন–

” চাকরি করিবার সময় যে সামান্য টাকাপয়সা
জমাইয়াছিলাম তাহা হইতে পুঁজি ভাঙিয়া খাইতে
খাইতে প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছিল। নিজের টাকা
দিয়া আশ্রমের গোড়াপত্তন করিয়াছিলাম; ইহাতে
অনেক টাকা খরচ হইয়া যাই। তিনবার জরিমানাতেও
তাই নয়শত টাকা গিয়েছে।… এ টাকা না পাইলে
আমাকে হয়তো আশ্রমের আয়ের উপরেই নির্ভর
করিতে হইত।” (পৃঃ ৭৮-৭৯)

 

একি বাবার নিঃস্বার্থভাবে দেশসেবা নয় ?কংগ্রেসের কাজে বাবা মাকে প্রায় জোর করেই টেনে এনেছেন–

“তাহার স্বাভাবিক ক্ষেত্রে একটি ঘরকন্যার সংসার,
নিবিড় সুখে ভরা, অতি দরদের সহিত নিজহাতে
গড়িয়া তোলা।… শেখান হইতে একরকম জোর
কোরিয়াই, আমি উহাকে অস্পষ্ট লক্ষ্যের কণ্টকময়
পথে লইয়া আসিয়াছি।” (পৃঃ-৮৩)

এইখানে বাবা দেশসেবা-রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হলেও হলেও স্ত্রী -স্বাধীনতা, স্ত্রীর মর্যাদা- আকাঙ্খাকে নস্যাৎ করেছেন। নিজের তৈরি করা পথেই স্ত্রীকে টেনে এনেছেন তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। বাবা-মার পথ ধরেই অনিবার্য সূত্রে এসেছে বিলু -নিলু ।তা না হলে তারা পড়াশোনা করে বাবার মত চাকরি করত।বিলু তো পড়াশুনায় যথেষ্ট ভালো। শিক্ষকতায় তার সাফল্য প্রশ্নাতীত।বাবা ভাবেন–

“… বিলু শিক্ষকতার লাইন ছাড়া অন্য কোন দিকে
থাকিলে বিশেষ সাফল্য অর্জন করিতে পারিত
না।…” (পৃঃ-৭৯)।

কমরেড বানারাসীর মুখ থেকেও বাবা বিলুর পড়াশোনার ব্যাপারে বিশেষ প্রশংসা শুনেছেন। এতে বিলু সম্পর্কে উদাসীন বাবা গর্ববোধ করেছেন ।কিন্তু বিলু মিলিট্যান্ট নয়–একথা শুনে ক্ষুব্ধ জাগরী উপন্যাসের বাবা প্রতিবাদের সুরে বলেন-

“…যে দেশের জন্য আজ রাত্রে ফাঁসি যাইবে তাহাকে তোমরা বল মিলিট্যান্ট নয়। সে কেন মিলিট্যান্ট হইবে মিলিট্যান্ট হইবে– মিলিট্যান্ট ঐ শুঁটকো বৈজনাথ–যে খানিক আগে গ্লাস লইয়া বাহির হইয়াছিল, ওয়ার্ডারের গায়ে জল দিবার জন্য।….”
(পৃঃ-৭৩)

এতে বাবার সমুন্নত দৃঢ়তা ও মর্যাদা প্রকাশ পায় ।দেশের জন্য হাসতে হাসতে জীবন দেওয়াকে তিনি পিতা হিসাবে গর্বের মনে করেন। এ সম্পর্কে তিনি ভাবেন–

“যাহার উপর পিতার কর্তব্য করি নাই, সেই পুত্রের
কৃতকর্মের গৌরবের অংশ লইতে আমার মন
কুণ্ঠিত নয়!… আমি যদি এ পথে না আসিতাম
তাহা হইলে আজ বিলুর এ দশা হইত?…”(পৃঃ৭৪)

এর থেকে জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্রে রাজনীতির প্রাধান্য লক্ষিত হয়। রাজনীতিরসর্বস্ব বাবা স্ত্রী-পুত্র -সংসারকে চরম উপেক্ষা করেছেন ।তাই মা বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন-

“তুমি দেশের স্বাধীনতার জন্য সব ছেড়েছ সত্যি,
কিন্তু আমাকে তো একটুও স্বাধীনতা দাওনি।…
তোমার জন্য আমার ছেলের এই হলো। আমার
সংসার ছারখার হয়ে গেল।…”(পৃঃ-১২৩)

সত্যিই তাই দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে নেমে নিজের পরিবারের কথা জাগরী উপন্যাসের বাবা ভুলেই ছিলেন।সেজন্য বিল -নীলুর মামা বাবাকে ‘পারফেক্ট ভ্যাগাবন্ড’ বলেছে। জাগরী উপন্যাসের বাবা যদি ছেলেদের শাসন করতেন তাহলে হয়তো বিলু-নিলুর আজ এ দশা হত না ।

জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্র

নীলুর বেপরোয়া স্বভাব বাবার শাসনে হয়তো সংযমের বাঁধনে আটকে যেত। বাবা যখন তার সম্পর্কে বলেন-

“… যা খামখেয়ালী আর দায়িত্বজ্ঞানহীন। এক বিলুর
কাছেই সে একটু ঠান্ডা হইয়া থাকে। সে কি আর
কাহাকেও মানুষ বলিয়া মনে করে, না আর কাহারও
কথায় কান দেয়? ছোটবেলা হইতেই সে শাসনের
বাইরে।”(পৃঃ-৭৮)

তখন বাবার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অবহেলার দিকটি কি উক্ত হয় না ?
জাগরী উপন্যাসের বাবার অবহেলা -উদাসীনতার সূত্র ধরেই অসংযমী ও খেয়ালী নীলু গান্ধী সেবা সংঘের টাকায় কলেজে পড়তে না চেয়ে বাবাকে সরাসরি আঘাত দিয়েছে এবং বড়দাদা বিলুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে তার ফাঁসীর হুকুমের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিণতিতে জাগরী উপন্যাসের বাবা না পেরেছে বিলুর ফাঁসীকে মেনে নিতে; না পেরেছে নীলু কে অভিশাপ দিতে। ভিতরে ভিতরে তিনি এক অব্যক্ত যন্ত্রনা অনুভব করেছেন। বাবার আত্মকথায় মাঝে মাঝে তা ধরাও দিয়েছে–

“না নীলু,ভগবান করুন তুমি কোনদিন যেন তোমার ভুল না বোঝো।” (পৃঃ-৮০)

একদিকে পিতৃসত্তা, অন্যদিকে নিজের কৃতকর্ম বাবাকে দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ করে তুলেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামী, কংগ্রেসের নেতা হলেও তিনি পিতা। রক্তে -মাংসে গড়া একজন মানুষ ।তাই বাবার মধ্যে দয়া- মায়া পিতৃত্ববোধ সমানভাবে উপস্থিত ।বিলুর জন্য তার হৃদয় কাঁদে। তিনি ভাবেন–

“মনি ইচ্ছা হয়,বিলু জানুক, যে তাহারই কথা মনে
এইবার জেলে ফলমূল দুধ এ সকল জিনিস খাই
না,মশারি ফেলিয়া শুই না। হয়তো, এ বিলু এ
খবর জানিতে পারিলে ,তাহার মনে একটু তৃপ্তি
হইত। তাহার বাবা যে তাহার জন্য একটু ভাবে
একথা সে বুঝিতে পারিত।…”(পৃঃ-৬৭)

উদ্ধৃতিটির মাধ্যমে পরিষ্কার বোঝা যায় পুত্র বিলু সম্পর্কে উদাসীন পিতা বিলুর ফাঁসীর রাত্রেএকান্তভাবে বিলুর চিন্তায় মগ্ন ।যে বিলু বাবার কাছ থেকে কখনো আদর পায়নি -যার মনের উপর বাবার কোনও স্মৃতি দাগ কাটে না, সেই বিলুকে জাগরী উপন্যাসের বাবা তার জন্য ত্যাগ ও কৃচ্ছ্রতার কথা জানিয়ে তৃপ্তি পেতে চায়। এখানে হতাশা ও যন্ত্রণাকে যন্ত্রণাকাতর পিতাকে পাওয়া যায় ।বাবার উদ্বিগ্ন মন বিলুর বাঁচা-মরা নিয়ে বিভোর-

“… আমি বুড়ো হইয়াছি-আমার মধ্যে এখনও বাঁচিবার আকাঙ্ক্ষা কত। আর বিলুর কিবা বয়স?… আর, আমিই ফিরিয়া যাইব-বিলু নয়।” (পৃঃ ৭৬-৭৭)

জাগরী উপন্যাসের বাবার মধ্যে পেলাম এক জীবনবাদী রূপ। মৃত্যু নয়, বিলুর বেঁচে থাকার দাবিতে জাগরী উপন্যাসের বাবা জীবনের জয়গান গাইলেন ।আরো এক ধাপ এগিয়ে বাবা সরস্বতীর সঙ্গে বিলুর বিবাহের কথা ভাবলেন ।এলো লেনিনের প্রসঙ্গ। কিন্তু বিলুর মায়ের আপত্তিতে সরস্বতীর সঙ্গে বিয়ে হলো না। বোঝা গেল বাবা নয়, বিলুর উপর মায়ের দাবির জোর বেশি। বিলু গোটা উপন্যাসে নীলু ও মা সম্পর্কে নানা কথা ভেবেছে, কিন্তু বাবা সম্পর্কে তেমন কিছুই ভাবেনি। ফাঁসীর ঠিক প্রাক-মুহূর্তের চিন্তায় “জ্যাঠাইমা ! সরস্বতী! মা !নীলু !নীলু তুই একি করলি?”(পৃঃ-৫৩) বিলু বাবা ছাড়া আর সবার কথা ভেবেছে।

এতে বোঝা যায় বাবার প্রতি কোথাও তার একটা সুপ্ত বিরাগ ছিল ।মনে হয় সেজন্যই বাবার অতৃপ্তি – যন্ত্রণা আরো বেশি। রাত্রি ৩-৪টার সময় বাবা ভাবেন–

“… মহাত্মাজী, আমার মনে বল দাও। সংযমের  বাঁধা আর বুঝি থাকে না। আর তো নিজেকে ঠিক রাখিতে পারিতেছি না।…”(পৃঃ-৮৯)

অপত্য স্নেহের টানে বাবা ক্রমশ সংযম হারিয়েছেন। পিতৃত্বের কাছে রাজনীতির কঠিন অনুশাসন আজ হার মানল।সুদীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে যে জাগরী উপন্যাসের বাবা বিলুর প্রতি ততটা আকর্ষণ অনুভব করেননি, তিনি আজ বিলুর বিদায় মুহূর্তে সংযমের শাসন হারিয়ে ভগবানের কাছে কাতরস্বরে প্রার্থনা করছেন-

“ভগবান তোমার নিকট হইতে কখনও কোন জিনিস
চাহি নাই। আজ এই কঠিন বিপদের সময় আমার
সকল সিদ্ধান্ত জলাঞ্জলি দিয়া, তোমাকে আমার
ইচ্ছা না জানাইয়া থাকিতে পারিলাম না। ভগবান,
বিলু কে শেষ মুহূর্তে অন্য কথা মনে পড়াইয়া দিও,
অন্যকথা ভাবিবার ক্ষমতা দিও অন্তিম মুহূর্তের
পূর্ব হইতেই, মৃত্যুভয়ে তিলে তিলে যেন তাহাকে না
মরিতে হয়।… “(পৃঃ-৯০)

জাগরী উপন্যাসের বাবার মৃত্যুভয়কে জয় করা এহেন অন্তিম প্রার্থনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা’ হাজার (১৯২২)নাটকের ধনঞ্জয় বৈরাগী চরিত্রটির জীবন দর্শনের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে ধনঞ্জয় শিবতরাই-এর প্রজাদের উত্তরকূটের শাসকদের শোষণ -অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তির জন্য মার ও মৃত্যুর ভয় কে জয় করার অভয়মন্ত্র দান করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ‘(১৯১০) নাটকের ঠাকুরদা সুরঙ্গমা;রক্তকরবী (১৯২৪) নাটকের বিশু পাগলা চরিত্রগুলোও প্রায় একই ভূমিকা পালন করেছে।

 

আসলে গান্ধীবাদের আলোকে গঠিত সতীনাথের ‘জাগরী’ উপন্যাসের বাবা চরিত্র এবং রবীন্দ্রনাথের ধনঞ্জয় বা বিশু পাগল চরিত্র একই Idea থেকে জাত। অহিংসা, প্রেমের মাধ্যমে আত্মিক শক্তির উদ্বোধন ঘটানো ও শোষক শক্তিকে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য করা। জাগরী উপন্যাসের বাবা  চরিত্র ১৯২০-২১খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজীর অহিংস -অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে সরাসরি কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ।সুতরাং তাঁর অন্তরে বাসা বেঁধেছে গান্ধী দর্শনের মর্মবাণী -প্রেম-অহিংসা ও কৃচ্ছ্রসাধনের বাণী।

একই Idea থেকে রবীন্দ্রনাথের ধনঞ্জয় এসেছে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে ।কারণ কবিগুরু নিজেও অহিংসা ও মানবতার পূজারী ছিলেন। যাই হোক বাবার এই অন্তিম প্রার্থনার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক সত্তার থেকে পিতৃ সত্তা বড় হয়ে উঠেছে ।কেন না তিনি পুত্রের কল্যাণেই স্বীয় দর্শনজাত প্রার্থনা জানিয়েছেন।

জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্রটির মধ্যে আবার অখন্ড মানস সত্তাটিও উপস্থিত ।রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে চান ।সোশ্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট দলের ছেলেদের তিনি নিজের ছেলের মতো দেখেন ।আপার ডিভিশন ওয়ার্ডে বাবার অবস্থান ডান- বামের মাঝখানে-

“ঘরে ঢুকিতে বাঁদিকে থাকে মহাত্মাজীর ভক্তের
দল অর্থাৎ কংগ্রেসের মেজরিটিপন্থীরা।…..
ঘরের ডান দিকটিতে থাকে সোস্যালিস্ট ও ফরওয়ার্ড
ব্লকের সদস্যরা। মধ্যে আমি বাফার-(Buffer).”
(পৃঃ-৫৯)

ঘরের মধ্যে তিনি যেমন কংগ্রেস এবং সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্টদের মাঝখানে মনের মধ্যেও অনেকটা তাই। চরখা কেটে রামরাজ্য স্থাপনের স্বপ্নে জাগরী উপন্যাসের বাবা পুরোপুরি গান্ধীবাদী কংগ্রেসী।এমনকি সোমবারে আত্মশুদ্ধি, সন্ধ্যার সময় প্রার্থনা, মহিষের দুধ-ঘি না খাওয়া ইত্যাদি আচারগত প্রশ্নেও তিনি গান্ধীবাদী কংগ্রেসী। কিন্তু তিনি দেখেন জেলের ভিতর কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে বিষুণদেওজী বড় ব্যবসাদার লোক-

“বিষুনদেও প্রত্যহ বিড়ি আনায়, আর দিনের বেলায়
মেটের হাত দিয়া এই বিড়িগুলি বিক্রি করিতে
পাঠায় জেল ফ্যাক্টরীতে। সেখানে সাধারণ
কয়েদীরা এই বিড়ি কেনে -দশ পয়সা প্যাকেট।
বিষুণদেওজীর ইহাতে বেশ লাভ থাকিয়া যায়।
মেয়ে মেম্বারদের মধ্যে যাহারা হয়তো একটু
গোলমাল করিতে পারে,তাহাদের মুখ বন্ধ করিবার
জন্য মধ্যে মধ্যে গন্ধ -তেল ও অন্যান্য টুকিটাকি
প্রয়োজনীয় জিনিস আনাইয়া দেয়।…”(পৃঃ-৬৯)

শুধু তিনি নন-রাজবন্দীদের অনেকেই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ।বিষুণদেওজী রাজবন্দীদের নিয়ে যে ছড়া রচনা করেছেন, তাতে রাজবন্দিরা তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত–

১. যোগাড়ানন্দ- এরা নানা জিনিস যোগাড়ের ফন্দি ফিকিরেই থাকে।
২. ঝাপট্টানন্দ- ছোঁ মেরে সেই জিনিসে ভাগ বসানো এদের কাজ।
৩. বেকুফানন্দ- ওসব থেকে নিজেকে আলাদা করে পরিষ্কার রাখা ।
এইসবের জন্য জাগরী উপন্যাসের বাবা আগেই যথার্থ মন্তব্য করেছেন–

“এমন সংসর্গে আসিয়াছি যে ইহারা মধ্যে নিজের নীতি ও সিদ্ধান্ত বজায় রাখিয়া চলাও শক্ত।”(পৃঃ-৬৬)

অন্যদিকে সোস্যালিস্ট ও কমিউনিস্ট দলের ছেলেরা হয়ত প্রার্থনায় বিরক্তি প্রকাশ করে, বিড়ি- সিগারেট খায়,প্রচণ্ড গরমেও কলার উঁচু পাঞ্জাবি পরে, সকাল আটটার আগে ঘুম থেকে ওঠে না; তবুও তাদের পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ বাবাকে বিস্মিত করে-

“রাজনীতিক্ষেত্রে আসিয়াও যে ইহারা পড়াশুনা
ভুলে নাই ইহা দেখিয়া সত্যই আনন্দ হয়।…
সোস্যালিস্টরা, ফরওয়ার্ড ব্লকের ছেলেরা কমিউনিস্ট
ও কিষান সভার ছেলে দুইটি সকলেরই পড়ার
উৎসাহ দেখি, আর অবাক হইয়া আমাদের পন্থার
কর্মীদের সহিত তুলনা করি।” (পৃঃ-৭০)

জাগরী উপন্যাসের বাবা তার নিরপক্ষে দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করে দেখান কেন সাধারন মানুষ কংগ্রেস অপেক্ষা সোস্যালিস্ট দলের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়–

“… নীলু বিলুদের দলের প্রোগ্রামের ভিত্তি, মানুষের
মন আজ যেমন আছে তাহারই উপর; আর আমাদের
কার্যক্রমের ভিত্তি, হিংসালোভহীন আদর্শ মানবমনের
উপর। সেইজন্য সাধারণ লোককে উহাদের পথই
আকর্ষণ করে বেশি।” (পৃঃ-৭০)

এভাবে দেখা যায় জাগরী উপন্যাসের বাবা দল-মত নির্বিশেষে উদার ও নিরপেক্ষভাবে আত্ম-পর সমালোচনা করেছেন। এতে তাঁর অখণ্ড মনের পরিচয় ভেসে ওঠে। গান্ধীজী যেমন দল-মত,জাতি-ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে এক পতাকাতলে এনে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, প্রায় একই রকম ভাবে বাবাও কংগ্রেস- সোস্যালিস্টদের তথা নবীন-প্রবীণ সবাইকে শেষপর্যন্ত আপার ডিভিশন ওয়ার্ডের ভজনগানে একত্রিত করতে পেরেছিলেন ।তবে জোর করে নয়,স্বতঃস্ফূর্তভাবে-

“… বিলুর দলের আজ ভজন গানেও আপত্তি নাই।…
বিলুর অন্তিম মুহূর্তে তাহার আত্মার শুভ কামনায়,
আর বিলুর বাবাকে একটু অন্যমনস্ক রাখিবার
প্রয়াসে, উহারা নিজেদের মতবাদ একটু নমনীয়
করিয়া লইয়াছে। বিলুর দল–ইহারা এটুকুও কি
করিবে না?…” (পৃঃ-৯১)

এখানে জাগরী উপন্যাসের বাবা চরিত্রটির মধ্যে কি আখন্ড মানস সত্তার দিকটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে না? সামগ্রিকভাবে ‘জাগরী’ উপন্যাসে বাবা চরিত্রটি তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়।

জাগরী
আত্মদীপ অগ্নিমান

আমাকে অনুসরণ করতে পারেন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামটুইটারে

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *