জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র

জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র

জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র

 

মাস্টার সাহেবের ছোট ছেলে, বিলুর ছোট ভাই জাগরী উপন্যাসের নীলু শেষ ভাবুক কথক। ফাঁসির আদেশের মূল কারণ সে ।ছোটবেলা থেকেই সে জেদি,একগুঁয়ে স্বভাবের। বড় দাদা বিলুকে ছাড়া সে আর কাউকে ভয় করে না। তার দৃষ্টিভঙ্গীরও চিন্তা- ভাবনার মধ্যে সূক্ষ্ম- তার অভাব ।তাই বিলু তার সম্পর্কে যথার্থই বলেছে-

” নীলুর মন ও দৃষ্টভঙ্গী স্থূল !কলম তুলিকা তাহার জন্য নয় -সে বোঝে কায়িক পরিশ্রমের কথা, হাতুড়ি কাস্তে শাবলের কথা, আর তার হাতে শোভা পায় ইস্পাতের ক্ষুরধার অসি__’ পরশুরামের কুঠারের মতো’ নিষ্করুণ ও কর্তব্যনিষ্ঠা।” (পৃঃ ১১)

সে যে সত্যিই কঠোর ও নিষ্করুণ তা বাবা

” নীলু চিরকালই একটু উদার স্বভাবের…”(পৃঃ ৭১)

ওর মা

” নীলু হলো গোঁয়ার গোবিন্দ ছেলে ও নিজের খেয়ালেই থাকে।”… (পৃঃ-১০১)

মন্তব্য থেকে বোঝা যায় ।একবার কোনো বিষয়ে নীলু স্থির সংকল্প করলে সেখান থেকে তাকে টলানো অসম্ভব। বাবা চরিত্রের সঙ্গে এখানেই তার মিল লক্ষ্য করা যায় ।বাবার চোখে তার আকার- আকৃতি এরকম-

” নীলুর বলিষ্ঠ ঋজুদেহ, ভাবুকতাহীন মুখ, বিলুর পাশে যেন মানায় না ।আজকাল নীলুকেই দেখিতে বিলু অপেক্ষা বড় বলিয়া মনে হয়।….” (পৃঃ-৭৮)

বাবা দু ‘ভাই-এর কথা বললে আগে নীলু পরে বিলুর কথা বলেন। অথচ নীলু গান্ধী সেবা সংঘের টাকায় কলেজে পড়তে চায় না। বিলুর দেওয়া টাকায় সে কলেজে পড়ে। তাই তার বিরুদ্ধে বাবার ক্ষোভ-

” দাদার নিকট হইতে টাকা লইতে নীলুর আপত্তি হইল না -যত সংকোচ আমার টাকা লইতে।” (পৃঃ-৭৯)

ছোটবেলা থেকে নিলু দাদা অন্তঃপ্রাণ। দাদা সর্বদা তাকে আগলে রাখে -দেখভাল করে। দু’জনের মধ্যে মাঝে -মধ্যে ঝগড়া ঝাটি হলেও আবার তা পরক্ষণেই মিটে যেত। জাগরী উপন্যাসের নীলু দেখত মা জ্যাঠাইমা থেকে হরদার দুবেজী ও তার স্ত্রী,জিতেনের মা বৌঠাকরুণ সবাই দাদা বিলুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। অথচ তাকে তেমন কেউ প্রশংসা করে না। এতে ভিতরে ভিতরে সে ক্ষুব্ধ হতে থাকে। তাই সুযোগ পেলেই নীলু বিলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে।

জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র
জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র

বিলু জ্যাঠাইমাকে ‘মা’ বলে। নীলু একথা মা-কে জানিয়ে দেয়। বিলুর কালিতে নীলুর বই নষ্ট হলে নীলুও বিলুর বই কেটে দিয়ে তার প্রতিশোধ নেয়। তার প্রতিশোধস্পৃহা এমন জায়গায় পৌঁছায় মে সে দেব- দেবীকেও ছাড়ে না। অঙ্কে পাশ করতে না পেরে নীলু সরস্বতী দেবীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবিখানার উপর বাড়ির সমস্ত জুতো এনে চাপায়। এ ব্যাপারে মায়ের মুখের উপর নীলুর সপাট জবাব-

“….না পড়া ছেলেকেই যদি পাশ করাতে না পারে তবে আবার ঠাকুর কিসের? (পৃঃ-১২০)

বোঝা যায় ক্রোধী, ঈর্ষাকাতর, স্বার্থপর জাগরী উপন্যাসের নীলুকে যেভাবেই হোক দাদার সমকক্ষ হওয়া তার চাই। দাদা সম্পর্কে নীলুর ভাবনা-

“পারিপার্শ্বিকের সহিত নিজের খারাপ হওয়াইয়া চলিবার ক্ষমতা তাঁহার অদ্ভুত।… যে কোনো সূক্ষ্ম বিষয় আমার অপেক্ষা ভালো বোঝে; কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত জীবনে, তাহার আচরণ যুক্তির শহিত সামঞ্জস্য রাখে না । …… বুদ্ধিশক্তির তীক্ষ্ণতা ও অনুভূতির তীব্রতা থাকা সত্বেও আবেগের উগ্রতা ও প্রাণশক্তি প্রচন্ডতা উহার মধ্যে নাই! প্রতি পদক্ষেপে তাহার মাপা।”( পৃষ্ঠা ১৩৭)

জাগরী উপন্যাসের নীলুর এই মন্তব্যে বিলুর প্রশংসা ও সমালোচনা দুই ধরা পড়ে। নিজের সঙ্গে তুলনা করার দিকটিও উপস্থিত। এই তুলনার মধ্যে লুকিয়ে আছে ব্যাক্তি স্বার্থ ও ইর্ষার বীজ। আর তা প্রকট আকার ধারণ করে খেলার প্রসঙ্গে। সব খেলায় প্রথম জাগরী উপন্যাসের নীলু বিলুর আড়ষ্টতার জন্য থ্রি-লেগ রেসে সফল হতে না পেরে মনের দুঃখে অন্য event- এ পাওয়া পুরস্কারগুলো পর্যন্ত মাকে দেখায়নি।

এরপর থেকে আর কোন খেলায় দু’জনকে পার্টনারশিপে খেলতে দেখা যায়নি। ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে। বিলুর স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতা এই ব্যবধান- কে আরও বাড়িয়ে দেয়। নিলু ভাবে-

“….প্রীতি, সৌজন্যে ও নমনীয়তার মধ্যে তাহার দৃঢ়তা অসীম। এক জায়গা গিয়া তাহারা নাগাল পাওয়া যায় না,–এত নিকট, তথাপি যেন একটু বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র। তাহার সেই অভিমান আমি একুশ বছরের মধ্যে শত চেষ্টাতেও ভাঙতেই পারি নাই” (পৃষ্ঠা-১৩৮)

গান্ধীবাদী বাবার সংস্পর্শে বেড়ে ওঠা জাগরী উপন্যাসের নীলু বিলু আশ্রমের প্রার্থনায় অংশগ্রহণ,দেবভক্তিতে বিশ্বাস- এর মাধ্যমে গড়ে উঠলেও পরে তারা কংগ্রেস সোস্যালিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়। কংগ্রেসের মধ্যে ধনী কৃষক কর্তৃক গরীব কৃষকদের উপর শোষন-অত্যাচার এর অন্যতম কারণ। কপিলদেও কর্তৃক দহিভাত গ্রামের প্রৌঢ় স্ত্রীলোকটির জমিজমা আত্মসাৎ করার চেষ্টা, কংগ্রেসের ঘুণধরা সংগঠন ইত্যাদির জন্য নীলু ১৯৩০-৩২ সালে দাদার সঙ্গে সিএসপি -তে যোগ দেয়। প্রবল উৎসাহে নীলু দাদার সঙ্গে মিলে কাজ করতে থাকে-

” ও যে কেবল সহকর্মী নয়,কেবল কমরেড নয়,-ও যে আমার দাদা ।কত সুখ -দুঃখের স্মৃতি বিজড়িত একসূত্রে গাঁথা আমাদের জীবন” (পৃঃ-১৪৩)

এত মিল সত্বেও ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে জেলের মধ্যে চন্দ্রদেও- এর সঙ্গে আলাপ হতেই নীলু সিএসপি ছেড়ে কমিউনিস্ট দলে যোগদান করে। দাদাকে না জানিয়ে নীলুর এই নতুন দলে যোগদান তাদের মধ্যে আরও দূরত্ব সৃষ্টি করে। এবার জাগরী উপন্যাসের নীলু রাজনীতিক্ষেত্রে তার নাবালকত্ব ঘোচাতে চায়।বিলুকে ছাড়িয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। জেগে ওঠে সুপ্ত ঈর্ষা। জাগরী উপন্যাসের নীলু ভাবতে থাকে-

“… রাজনীতিক কর্মীর জীবন তাহার পার্টির ভিতরে– পার্টির বাহিরের অস্তিত্ব তাহাকে একেবারে লুপ্ত করিয়া দিতে হইবে ।ইহার পর হইতে আমি দাদাকে এড়াইয়া চলিবার চেষ্টা করিয়াছি।… দাদা যে একটি প্রতিদ্বন্ধী দলের নামজাদা কর্মী । উহার সহিত অন্তরঙ্গতা আমার পার্টির লোকেরা নিশ্চয়ই পছন্দ করিবে না।…”(পৃঃ-১৪৪)

নিলু পার্টিসর্বস্ব আচরণ করলেও বিলু কিন্তু তার দাদা হিসাবে বিছানাপত্র তৈরি করে দেওয়া, বাবা-মার চিঠির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া ইত্যাদি কাজ স্বাচ্ছন্দে করতে থাকে ।বোঝা যায় নীলু অনেকটা পাল্টে গেছে। পরিবর্তিত নীলুর ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা ও তার দাদা বিলুর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেয়। আর তার পরিণতিতে বিলুর ফাঁসীর আদেশ হয়।

বিলুর বিরুদ্ধে নীলুর সাক্ষ্য দেওয়ার ঘটনা উপন্যাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এই সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে জাগরী উপন্যাসের প্রধান ৪টি চরিত্র ছাড়াও অপ্রধান চরিত্র এমনকি জনতা চরিত্রেও ভেবেছে। জাগরী উপন্যাসের নীলুর বাবা ক্ষুব্ধচিত্তে নীলুকে লক্ষ্য করে বলেছেন-

“… অন্যায় ও ক্ষতি যাহা হইবার হইয়া গিয়াছে। সারাজীবন উঠিতে বসিতে একথা তোমাকে খোঁচা দিবে। তিলে তিলে অনুতাপে জ্বালা তোমাকে দগ্ধাইবে- তবুও তোমার কৃত-কর্মের প্রায়শ্চিত্ত হইবে না”(পৃঃ-৮০)

বাবার সত্যদৃষ্টিতে জাগরী উপন্যাসের নীলুর ভুল সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। দাদা অন্তপ্রাণ যে নীলকেু বিলু সর্বদায় বিপদে-আপদে রক্ষা করেছে, সেই বিলুর বিরুদ্ধে নীলুর সাক্ষ্য দেওয়ার ঘটনাকে মা ও বিশ্বাস করতে পারছেন না-

“নিলু যদি তাই করে থাকে তাহলে ও ছেলের আর আমি মুখ দেখব? যেখানে দুচোখ যায় সেখানে চলে যাব।…”( পৃষ্ঠা-১১৩)

বিলু নিজেও শেষ মুহূর্তে ভেবেছে–“… নীলু তুই একি করলি ?”(পৃষ্ঠা-৫৩)

প্রধান তিনটি চরিত্রের পাশে আসামী হরিশচন্দ্র আসামীর কাঠগড়া় থেকে তীব্র ভাষায় নীলুকে আক্রমণ করে বলে –

“কেয়া কারোগে? ফাঁসী সে ভি কুছ বেশী দেওগে কেয়া?” (পৃঃ-১৩০)

প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও জাগরী উপন্যাসের নীলু বিরূপ মনোভাব প্রত্যক্ষ করে

“….পাড়ার ছেলেমেয়েদের বিস্মিতও অনুসন্ধিৎসু চোক্ষে আমার দিকে তাকাইতে দেখিয়াছি। বাল্যবন্ধু সৌরিন পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইতে কুন্ঠিত হয় নাই। মরিবার ভয় দেখানো বেনামী চিঠি পাইয়াছি ।……. জ্যাঠাইমা ও ন’দি পর্যন্ত নেহাত কাজের কথা ব্যতীত অন্য কথা বলেন না ।” (পৃঃ-১২৯)

সর্বোপরি জনতা নীলুকে ভৎসনাপূর্ণ দৃষ্টিতে এবং ওয়ার্ডাররা নীলুকে চিড়িয়াখানায় বন্যজন্তুকে দেখার দৃষ্টিতে দেখেছে। এসব থেকে বোঝা যায় নীলুর সাক্ষ্য দানের ঘটনা পরিবারের ভিতর ও বাইরের মানুষ সবাই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছে। এটি জাগরী উপন্যাসের নীলুর ভুল মারাত্মক ভুল।

নিলু আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলে-

“….রাজনীতি-ক্ষেত্রে, আমি নীলু,আর সে দাদা নয়। এখানে যে ব্যক্তিগত প্রশ্ন ছাড়িয়ে, যুক্তির কষ্টিপাথরে প্রত্যেক কার্য-পদ্ধতি যাচাই করিতে হইবে;…”(পৃঃ-১৪৩)

কিন্তু ভিতরে একটা চাপা উদ্বেগ নীলুকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। সেভাবে যে বিলু তাকে ভুল বুঝবে না। এমন কি বিলুর সঙ্গে কথা বলতে পারলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যেতে বলে তার ধারণা। অন্তরাত্মার বিরোধিতায় যুক্তি-বুদ্ধিহীন নীলু ভাবে–

“… কিন্তু সকল যুক্তিকে পরাস্ত করিয়া অন্তরের ভিতর কোথায় যেন খচ খচ করিয়া কী একটা বিঁধেতেছে। বোধ হয় যুক্তিহীন ভাবপ্রবনতার অহেতুক অনুতাপ ।আমার নিজের পার্টির স্থানীয় শাখার মেম্বারদেরও মত যে দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া আমার ঠিক হয় নাই ।” (পৃষ্ঠা-১৫৩)

রাজনীতি সর্বস্ব নীলু যখন নিজের পার্টির সদস্যদের বিরূপ মনোভাব প্রত্যক্ষ করে, তখন সে আরো দুর্বল হয়ে পড়ে ।কারণ ঐ ঘোর সঙ্কটের সময় পার্টিই তো তার একমাত্র সান্ত্বনা ও আশ্রয় স্থান। অথচ পার্টির স্থানীয় শাখার সদস্যদের যুক্তি হল–

“… আমাদের কর্তব্য দেশের লোককে তাহাদের ভ্রম চোখে আঙুল দিয়ে দেখাইয়া দেওয়া, তাহাদের বুঝানো। তাহাদের পুলিশে ধরাইয়া দেওয়া নাকি আমাদের কর্তব্যের মধ্যে নয় ।”(পৃঃ-১৫৩)

দ্বন্দ্বক্ষত জাগরী উপন্যাসের নীলু এবার নিজেই নিজের কৃতকর্মের জন্য ভিতরে ভিতরে দহন-জ্বলন অনুভব করে। এটাই স্বাভাবিক ।কেননা সাময়িক উত্তেজনার মোহে আবেগাতুর হয়ে নীলু যে কাজ করেছে তা রাজনীতি ও পরিবার বৃত্তের বাইরে। জেদি, একগুঁয়ে নীলু ঈর্ষাবশত হঠকারীভাবে দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে নিজেকে বড় করে তুলে ধরতে গিয়ে নিজেই ধরাশয়ী হয়েছে। অবিমৃশ্যকারী জাগরী উপন্যাসের নীলু দ্বন্দ্বক্ষত হৃদয়ে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ভাবে-

” দাদা… জনমত আর সর্বাপেক্ষা দুঃসহই আমার পার্টির স্থানীয় কমরেডের মত। ভুল! পৃথিবীসুদ্ধ লোকের ভুল হইতে পারে, আমার ভুল হয় নাই ।সেই ১৯৪২- এর আগস্টের ঘটনাসমূহের পরিবেশে আমার কার্যের বিচার করিতে হইবে ।…” (পৃঃ-১৫৪)

অরাজকতা,বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জাতীয় শক্তির অপচয়ের দোহাই দিয়ে নিলু যতই নিজেকে মুক্ত করতে উদ্যোগী হোক না কেন সে নিজেও জানে যা কিছু হয়েছে তা দেশের স্বাধীনতার জন্য স্বরাজ্যের জন্যই হয়েছে। কিন্তু তার সাক্ষ্যদান নিজের স্বার্থেই নিজের ঈর্ষান্বিত মনই এ কাজ করেছে। পরিশেষে বিবেকের দংশনে ক্ষতবিক্ষত নীলু জীবনযুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মত পালিয়ে যেতে চেয়েছে-

“…. ইহার পর আমার আর পূর্ণিয়ায় থাকা অসম্ভব।
জ্যাঠাইমাকে মুখ দেখাইব কী করিয়া?…মা’র সম্মুখে যাওয়া – সেতো অসম্ভব।” (পৃঃ-১৫৯)

পরিবারধর্ম তথা মানবধর্মকে উপেক্ষা করে কোন নীতি- ধর্ম বড় হতে পারে না। নিলু এই সত্য বিস্মৃত হওয়ায় বিপত্তি ঘটেছে ।সর্বোপরি যে পার্টির কথা ভেবে সে এই কাজ করেছে সেই পার্টির ( কমিউনিস্ট পার্টি) তত্ত্বকথা সে ভালো বোঝে না তা সে নিজেই স্বীকার করেছে–

“মার্কসবাদের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ হয়তো আমি ঠিক বুঝি না। যতদিন দাদাদের দলে ছিলাম দাদারই হুকুম তালিম করিয়া আসিয়াছি। উহার কথাই বেদবাক্য বলিয়া মনে করিয়াছি ।”(পৃঃ-১৫৩)

এ থেকে বোঝা যায় দাদার প্রতি তার এই আচরণ চরম বিশ্বাসঘাতকতা। কেননা দাদা তো তার কোন ক্ষতি করেনি। বরঞ্চ জেলের বাইরের মত জেলের ভিতরে সেলের মধ্যে বসেও দাদা বিলু আদর্শ দাদার মত ব্যবহার করেছে নীলুর সঙ্গে ।পাঠকের সমর্থক ও সহানুভূতি দুই থেকে বঞ্চিত হয়েছে নীলু। বরঞ্চঅধিক সহানুভূতি লাভ করেছে বিলু ।স্রষ্টা সতীনাথের সহানুভূতিপুষ্ট এই বিলু তাই শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে ফাঁসীর আদেশ স্থগিত হয়ে গেছে। মৃত্যুঞ্জয়ী জাগরী উপন্যাসের নীলু শেষপর্যন্ত জয়লাভ করেছে। নীলুর কথায় তা এরকম–

“…ধমনীর স্পন্দন আবার আরম্ভ হয় ।গাছে গাছে পাখির কাকলি -পাতায় পাতায় প্রভাত সমীরের দোলা– লাস্যময়ী পৃথিবীর আবার নানা ছন্দে লীলায়িত হইয়া উঠিয়াছে। পাথরের জেলগেটের উপরতলায় হঠাৎ ঊষার অরক্তিম আলোর মধুর ঝমক লাগে।”(পৃঃ-১৬৪)

বিলুর জীবনে তথা রাষ্ট্রীয় পরিবারে নতুন সূর্যোদয় ঘটল। কিন্তু নীলুর পরিণতি ?হতাশা ও বিষাদের ছায়ায় আচ্ছন্ন– মৃত্যুর অধিক যন্ত্রণায় কাতর এক দীর্ঘ অবস্থা।

জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র
জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্র

১৬৪পৃষ্ঠার উপন্যাসটির মধ্যে চারটি প্রধান চরিত্রের আত্মকথনের মাধ্যমে যেভাবে অঙ্কিত হয়েছে, তাতে সে একটি বিবর্তিত চরিত্র বা Rounded character হিসাবে ফুটে উঠেছে। কেন না বোধের এক সীমা থেকে সে অন্য সীমায় পৌঁছে গেছে; নিজের কৃতকর্মের দ্বারা সে অন্যকে ভাবিয়েছে নিজেও ভেবেছে।

শেষে পৌঁছে গিয়েছে নতুন ভাবনার জগতে। দাদাঅন্তপ্রাণ নীলু রাজনীতির সরণী বেয়ে দাদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে ফাঁসীর আদেশের কারণ হয়েছে ।আবার সেই দাদার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য জেলগেটে দুশ্চিন্তায় রাত কাটিয়েছে।

চিন্তার স্রোতে রাষ্ট্রীয় পরিবারের সদস্য নীলু পরিবার ছেড়ে বাইরে পালিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছে। তাই সব মিলিয়ে একটি বিবর্তিত চরিত্র হয়ে উঠেছে। নীলু জেল গেটে থেকে জেলের ভিতরের পরিবেশ ওয়ার্ডার, ডাক্তার, সুবাদার, জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট প্রভৃতির স্বভাব-প্রকৃতি সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে।

যন্ত্রবৎ একঘেয়ে ওয়ার্ডারের কাজ, ডাক্তার সুবাদারের সুযোগসন্ধানী মনোবৃত্ত,জেলর- সুপারিন্টেন্ডেন্টের তত্ত্বাবধান ও তদারকের নানা দিক নীলু পর্যবেক্ষণ করেছে ।এতে জেলের অন্দরমহলের নানা বিষয় নীলুর চোখ দিয়ে পাঠক জেনে নিতে পারে।

গোটা জাগরী উপন্যাসের নীলু চরিত্রটি সতীনাথ যেভাবে দেখিয়েছেন, তাতে কমিউনিস্ট নীলু সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন থেকে যায় ।

উপন্যাসের প্রথম থেকে দাদা অন্তপ্রাণ নীলু সুখে-দুঃখে,বিপদে -সম্পদে বিলুর পাশাপাশি থেকে কাজ করেছে ।কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের পর সে যেভাবে দাদার থেকে দূরে সরে গেছে এবং দাদার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়ে তার ফাঁসীর আদেশের কারণ হয়েছে, তাতে পাঠকের ঔচিত্যবোধে আঘাত লাগে।

জাগরী উপন্যাসের নীলু মতই ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরোধিতার যুক্তি দেখিয়ে ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে বিলুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা বলুক না কেন পিতা-মাতা থেকে প্রতিবেশী, ওয়ার্ডার থেকে জনতা সবার চোখে সে অপরাধী -ঘৃণ্য কাজের হোতা।সর্বোপরি কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় শাখার সদস্যরাও নীলুর কাজের বিরোধিতা করেছে।

তারা এ ব্যাপারে অকাট্য যুক্তি দেখিয়েছে। তাহলে নীলুর সাক্ষ্যদানের ঘটনা হঠকারিতা ছাড়া আর কি !এতে নীলুর সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন থাকল কি? সর্বোপরি উপন্যাসের শেষে মহৎ ও আদর্শবান বিলুর জয় এবং নীলুর পরাজয় ও পলায়নের ইচ্ছা চরিত্রটিকে কোথায় নামিয়ে দিয়েছে ?যে ‘ইজম’ কে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছিল তাতে কোনো গলদ ছিল না কি ছিল চরিত্রটির গোড়ায়? এরকম অনেক প্রশ্ন পাঠককে ভাবায়।

তাই নীলু চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে উপন্যাসিক সতীনাথের ভূমিকা নিয়ে গোপাল হালদার, নীরেন্দ্রনাথ রায় প্রমুখ সমালোচকগণ সঙ্গত প্রশ্নই তুলেছেন।

আমাকে অনুসরণ করতে পারেন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামটুইটারে

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *