চৈতন্য অবতারের কারণ

চৈতন্য অবতারের কারণ

চৈতন্য অবতারের কারণ

 

নবদ্বীপলীলায় শ্রীচৈতন্যদেবের তাঁর আবির্ভাবের সময় থেকেই কৃষ্ণাবতার রূপে পূজিত। কিন্তু চৈতন্যাবতারের হেতু কি? দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছিলেন কংস-নিধন ও ভূভার হরণের জন্য। প্রচলিত ধারণা কলিযুগের পাপ হরণের জন্য শ্রীচৈতন্যরূপে স্বয়ং ভগবানের পুনরাবির্ভাব।

প্রথম বাংলা চৈতন্যচরিত কার বৃন্দাবন দাস লিখেছেন-

“কোন হেতু কৃষ্ণচন্দ্র করে অবতার।
কার-শক্তি আছে তত্ত্ব জানিতে তাহার।।”

আপনি পড়ছেন : চৈতন্য অবতারের কারণ

অবতার হিসেবে শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবের কারণের কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রথমেই গীতার

‘‘যদা যদা হি-ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।।”

—এই শ্লোকটি উদ্ধৃত করেছেন। এখানে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন, যখনই ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান। হয়, সেই সেই সময়ে আমি দেহ ধারণ করে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই। সেই সঙ্গে গীতায় আরও বলা হয়েছে—সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্ট দের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি । যুগে যুগে অবতীর্ণ হই। গীতার এই আশ্বাসবাণী প্রচলিত লোক ধারণা ও বিশ্বাসে তাে ছিলই, তাছাড়াও বৃন্দাবন দাস ‘চৈতন্য ভাগবত’

লেখার আগে চৈতন্য পরিকর নিত্যানন্দের কাছে পাঠ-দীক্ষা পেয়েছিলেন, সেই সঙ্গে গৌড়ীয় বৈষ্ণবীয় ধ্যান-ধারণায় বৃন্দাবন দাসের ধর্ম-মানসিকতা পরিশীলিত হয়েছিল। বৃন্দাবন দাস চৈতন্য আবির্ভাবের দুটি কারণের উল্লেখ করেছিলেন, তা হল—নামসংকীর্তন প্রচার ও পাষণ্ড উদ্ধার।

চৈতন্য অবতারের কারণ
চৈতন্য অবতারের কারণ

কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্য জীবনকে কেন্দ্র করে এ প্রসঙ্গে বৈষ্ণব দর্শনের অবতারণা করেছেন। কৃষ্ণ দাস কবিরাজ বৃন্দাবনের ষড় গোস্বামী অন্যতম রঘুনাথ দাস-গোস্বামী শিষ্য ছিলেন। চৈতন্য জীবনী গ্রন্থ রচনা করতে গিয়ে তিনি ভাগবত, উজ্জ্বলনীলমণি, ভক্তিরসামৃত সিন্ধু, বিদগ্ধমাধব নাটক, বিষ্ণুপুরাণ প্রভৃতি বহু গ্রন্থ প্রামাণ্য রূপে গ্রহণ করেছেন, সেই সঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শী মুরারি গুপ্তের কডচা এবং চৈতন্য পরিকর স্বরূপ, লামােদরের কড়চার সাহায্য নিয়েছেন।

আপনি পড়ছেন : চৈতন্য অবতারের কারণ

রূপ গোস্বামী বিদগ্ধমাধব নাটকের একটি শ্লোক কবিরাজ গোস্বামী তা চতন্যচরিতামৃতের আদি লীলা তৃতীয় পরিচ্ছেদে উদ্ধৃত করেছেন। স্বয়ং ভগ কলিকালে শচী মাতার গর্ভে শ্রীচৈতন্য রূপে অবতার হয়ে জন্মেছে। জগতে প্রেম দান করাই তার এই অবতারের উদ্দেশ্য।

অনর্পিতচরীং  চিরাৎ করুণায়াবতীর্ণঃ কলৌ।
সমর্পয়িতুমুন্নতোজ্জ্বলরসাং স্বভক্তিশ্রিয়ম্।।

এই শ্লোকটির অর্থই হল, সোনার মতো উজ্জ্বল আভায় দীপ্তিমান শচীনন্দন হরি তোমার হৃদয়ে স্মৃতি লাভ করেন। তিনি যে সর্বোৎকৃষ্ট উজ্জ্বল রসের ভক্তিশ্রী জগৎকে এ যাবৎ কখনও দান করেন নি, সেই প্রেমভক্তি সম্পদ দান করার জন্য কলিকালে অবতীর্ণ হয়েছেন—ইত্যাদি। স্বরূপ দামোদর তার কড়চা চৈতন্য দেবকে প্রণাম জানিয়েছেন এই বলে—

“চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্বয়ং চৈক্যমাপ্তং।
রাধাভাব দ্যুতি সুবলং নৌমি কৃষ্ণ স্বরূপ।”

একাত্ম হয়েও কেবলমাত্র লীলা প্রচারের জন্যই রাধা-কৃষ্ণ পৃথক দেহ ধারণ করেছেন। এখন কলিযুগে আবার সেই দুই দেহ এক হয়ে চৈতন্য নামে প্রকট হয়েছেন। কবিরাজ গোস্বামী এর দুটি কারণ দেখিয়েছেন, একটি অন্তরঙ্গ বা মুখ্য কারণ, আর অন্যটি বহিরঙ্গ বা গৌণ কারণ। পূর্ব প্রচলিত ধারণাকে ব্যাখ্যা করে কৃষ্ণদাস বলেছেন কেবলমাত্র ভূ-ভার হরণই চৈতন্যঅবতারের মূল কারণ নয়। আদি লীলা চতুর্থ পরিচ্ছেদে কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন—

“স্বয়ং ভগবানের কর্ম নহে ভার হরণ।
স্থিতিকর্তা বিষ্ণু করে জগৎ পালন।।
কিন্তু কৃষ্ণের হয় সেই অবতার কাল।
ভার হরণ কাল তাতে হইল মিশাল।।”

রাধার ভাব কান্তি অঙ্গীকার করে তিন সুখ’ আস্বাদনের জন্য শ্রীকৃষ্ণ শ্রী চৈতন্য রূপে নবদ্বীপ লীলা প্রকটন করেন। কবিরাজ গোস্বামী তার চৈতন্যচরিতামৃত এটাই চৈতন্য আবির্ভাবের প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে পূর্ণশক্তিমান কৃষ্ণ পূর্ণ শক্তি শ্রীরাধার ভাব ও কান্তি অঙ্গীকার করে জগতের জীবসমূহকে প্রেমভক্তি শিক্ষা দেবার জন্য শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। স্বরূপ দামোদর তার কড়চা চৈতন্য আবির্ভাবের যে কারণ পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্লোকে বর্ণনা করেছেন কবিরাজ গােস্বামী তার আলোচনা করেছেন। স্বরূপ দামোদরের শ্লোক হল—

“শ্রী রাধায়ঃ প্রণয়মহিমা কীদৃশো বানয়ৈবা—
স্বাদ্যো যেনাদ্ভুতমধুরিমা কীদৃশাে বা মদীয়ঃ।
সৌখ্যঞ্চস্যা মদনুভবতঃ কীদৃশোং বেতি লােভা—
তদ্ভাবাঢ্যঃ সমজনি শচীগৰ্ভসিন্ধৌ হরীন্দুঃ ।।”

—এর অর্থ হল, শ্রীরাধার প্রণয়মহিমা কেমন, আমার মাধুর্য যা রাধা আস্বাদ করে—তা-ই-বা কেমন, আমার মাধুর্যের অনুভূতি থেকে শ্রীরাধারই বা কী সুখের উদয় হয়—এই তিন বিষয়ে লােভ জন্মালে শ্রীকৃষ্ণরূপ চন্দ্র শচীগর্ভ সমুদ্রে জন্ম গ্রহণ করলেন।

আপনি পড়ছেন : চৈতন্য অবতারের কারণ

প্রকট ব্রজলীলায় কৃষ্ণের তিনটি লােভ বা বাসনার অপূর্ণতা ছিল। তা হল

১। শ্রীরাধা প্রণয় মহিমা কেমন?
২। শ্রীরাধা আস্বাদিত কৃষ্ণের মধুরিমা কেমন?
৩। কৃষ্ণের মাধুর্যের অনুভূতি থেকে শ্রীরাধার যে সুখ জন্মে তাই বা কেমন?

এই তিন লােভের বাসনা পূরণের জন্য কৃষ্ণাবতার চৈতন্যাবহার হয়েছেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতে শ্রীচৈতন্যের অবতার হওয়ার এটাই অন্তরঙ্গ বা মুখ্য কারণ। স্বরূপ দামোদর তার কড়চা রাধা কৃষ্ণের প্রণয় বিকৃতি হ্লাদিনী শক্তি ইত্যাদি শ্লোকটিতে রাধাকে কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি বলেছেন। হ্লাদিনী শক্তির ঘনীভূত বিলাস কে প্রেম বলে। সেই প্রেমের ঘনীভূত অবস্থার নাম মহাভাব। শ্রীমতী রাধা সেই মহাভাবস্বরূপিনী। ব্রজলীলা কৃষ্ণ ছিলেন রাধা প্রেমের বিষয়। বিষয় রূপে প্রেমের আস্বাদনে যে সুখ আশ্রয় রূপে তার আস্বাদন কোটি গুণ বেশি। কবিরাজ গোস্বামী লিখেছেন

“বিষয় জাতীয় সুখ আমার আস্বাদ।
আমার হৈতে কোটী গুণ আশ্রয়ের আহ্বাদ।”

সেই জন্য

কভু যদি হই এই প্রেমার আশ্রয়।
তবে এই প্রেমানন্দের অনুভব হয়।।”

—সেই আশ্রয়জাতীয় সুখের কথা চিন্তা করতে করতে কৃষ্ণ সিদ্ধান্ত করলেন যদি তিনি কখনাে মাদনাখ্য ভাবের আশ্রয় হতে পারেন তবে প্রেমের সেই আনন্দানুভবে সক্ষম হবেন। নিজের মাধুর্য আস্বাদন করা হল তার দ্বিতীয় বাসনা। অনন্ত ও অদ্ভুত বলে কৃষ্ণ মাধুর্য আস্বাদন অসম্ভব কিন্তু মাদনাখ্য মহাভাব স্বরূপা রাধা প্রতি নিয়ত সেই কৃষ্ণ মাধুর্য আস্বাদন করে। চৈতন্যচরিতামৃত আছে—

“অদ্ভুত অনন্ত পূর্ণ মা মধুরিমা।
ত্রিজগতে ইহার কেহ নাহি পায় সীমা।।”

কৃষ্ণের তৃতীয় বাসনা অত্যন্ত গোপন। কৃষ্ণের মাধুর্য আস্বাদন করে রাধা যে সুখ পান তা জানার বাসনাই হল তৃতীয় বাসনা। স্বরূপ গােস্বামী মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ ছিলেন বলে এ সব প্রসঙ্গ’ জানতেন। কৃষ্ণের মাধুর্যজনিত সুখানুভূতি রাধারই সবচেয়ে বেশি। কৃষ্ণের মাধুর্য আস্বাদন জনিত সুখে রাধার যে সর্বাতিশায়ী উল্লাস তা কৃষ্ণকে নিজের মাধুর্য আস্বাদন জন্য প্রলোভিত করে, কিন্তু রাধার প্রেমজনিত সুখের স্বরূপ। রাধাভাব ভিন্ন কৃষ্ণের পক্ষে লাভ করা কোনমতেই সম্ভব নয়। সেইজন্য তার সিদ্ধান্ত

“আমা হৈতে রাধা পায় যে জাতীয় সুখ।
তাহা আস্বাদিতে আমি সদাই উন্মুখ।।

রাধিকার ভাব কান্তি অঙ্গীকার বিনে।
সেই তিন সুখ কভু নহে আস্বাদনে।
রাধাভাব অঙ্গীকার ধরি তার বর্ণ।
তিন সুখ আস্বাদিত হব অবতীর্ণ।।”

রসিকা শেখর কৃষ্ণের প্রেম রস আস্বাদন বাসনা কখনো অপূর্ণ থাকতে পারে না, কারণ তাহলে তার রসিক-শেখরত্বের বিকাশও অপূর্ণ থেকে যায়। শ্রীরাধা কৃষ্ণের স্বরূপ শক্তির অংশ। তাই কৃষ্ণের বাসনা পূরণের জন্য এবং সেবা দ্বারা কৃষ্ণকে সুখী করার। জন্য শ্রীরাধা তাঁর মাদনাখ্য মহাভাব কৃষ্ণকে দিলেন এবং নিজের রাধিকা নাম সার্থক করলেন। নিজের প্রতিটি অঙ্গদ্বারা কৃষ্ণকে আলিঙ্গন করে তাকে ভাবরূপা রাধায় পরিণত করবেন। কিভাবে ‘রাধাভাবদ্যুতি সুবলিত’ কৃষ্ণই নবদ্বীপে গৌর সুন্দর রূপে আবির্ভূত হলেন। এই মধুর রসের সর্বাধিক বৈচিত্র্য আস্বাদনই চৈতন্যাবতারের মুখ্য উদ্দেশ্য। |

আপনি পড়ছেন : চৈতন্য অবতারের কারণ

শ্রীচৈতন্যের নবদ্বীপ লীলা প্রকটনের অন্য উদ্দেশ্য রাগমার্গের ভক্তি প্রচার। শুধু তাই নয় যে বস্তু লাভের জন্য ভজনের উপদেশ ও ভজনের আদর্শ প্রদর্শনের প্রয়ােজন, সেই প্রেমভক্তি কলির জীবকে দেওয়ার সংকল্পে গৌরলীলায় ছিল।

“যুগধর্ম প্রবর্তন হয় অংশ হৈতে।
আমার বিনা অন্য নারে ব্রজ প্রেম দিতে ৷৷”

এদিকে যুগাবতার এর আবির্ভাবকাল উপস্থিত। নবদ্বীপের পণ্ডিত সমাজ শুষ্ক পাণ্ডিত্যের অভিমানে মত্ত। ধর্মের এই গ্লানিকর অবস্থায়, অদ্বৈতাচার্য প্রভৃতির আন্তরিক প্রার্থনায় অবতরণ মুহূর্তটি পূর্ণ হল। সপরিকর কৃষ্ণচন্দ্র গৌর সুন্দররূপে নবদ্বীপ আবির্ভূত হলেন।

কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত – ড. অশোক চট্টোপাধ্যায়
বই কিনে পড়ুন

আমাকে অনুসরণ করতে পারেন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামটুইটারে

Spread the love

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *