মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

 

মেঘনাদবধ কাব্যের কেন্দ্রীয় আকর্ষন “মেঘনাদ”, দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস, কবুর কুলের গর্ব, বাসব- বিজয়ী। কিন্তু বীরত্ব বা পরাক্রম এই চরিত্রের যথাসর্বস্ব নহে। পৌরুষের মূর্ত প্রতীক বলিলেও ইহার সমগ্রপরিচয় দেওয়া হয় না।

পৌরুষের সহিত মানবতার বিচিত্র আবেদনের অপার্থিব সমন্বয় রচিত হইয়াছে মেঘনাদ চরিত্র-এর কাঠামো যাহার নমুনা প্রাচ্য- পাশ্চাত্য কোনো সাহিত্যে অবিকল খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।

যোগীন্দ্রনাথ বসু একস্থানে মন্তব্য করেছেন,

” মধুসূদন হেক্টরকে মেঘনাদের আদর্শ রূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন বলিয়াই চরিত্রটি এইরূপ উন্নত হইয়াছে।” কিন্তু কেবল “নির্ভীকতা ও মহাপ্রাণতা”-ই যদি মেঘনাদ চরিত্র-এর আকর্ষণ হইত, কেবল পৌরুষ ও আত্মপ্রত্যয়ের মহিমাই যদি এই চরিত্রের মহিমা হইত, তবে এইরূপ বলা চলিত।

প্রকৃতপ্রস্তাবে মেঘনাদের মধ্যে হেক্টরের ছাপ দেখা যাইতে পারে, বা মাইকেলের পরিকল্পনা হোমারের পরিকল্পনা দ্বারা অনেকখানি প্রভাবিত হইতে পারে, কিন্তু মানুষ হিসাবে এবং বহুমুখী আবেদন- বিশিষ্ট চরিত্র হিসাবে মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র হেক্টর অপেক্ষা অনেক বড়ো।

তিনি একদিকে যেমন বজ্র-কঠোর বীর-যোদ্ধা, অপরদিকে তেমনি কুসুম -কোমল হৃদয়বিশিষ্ট আদর্শ ভ্রাতা, আদর্শ স্বামীও আদর্শ পুত্র ।তবে পৌরুষের মাহাত্ম্যই যে এই চরিত্রের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য তাহাতে দ্বিমত নাই।

পৌরুষদর্পী ইন্দ্রজিৎ পৌরুষ মধুসূদনের মানষ- সন্তান- কোবির নিজের মানস-প্রকৃতি এই চরিত্রের আগাগোড়া সঞ্চারিত হইয়া রহিয়াছে; তাই মেঘনাদ চরিত্র শৌর্যে ও শিষ্টাচারে, বীরত্বে ও ব্যক্তিত্বে এমন দেদীপ্যমান।

মেঘনাদ চরিত্র -সৃষ্টির স্বরূপ বুঝিতে হইলে আমাদের প্রথম, পঞ্চমষষ্ঠ সর্গের সন্ধানী দৃষ্টিতে বিচরণ করিতে হয় ।এই তিনটি সর্গের মধ্যে যদিও এক ষষ্ঠ সর্গেই মেঘনাদের সকল শ্রেষ্ঠ গুণের পরিচয়, তথাপি মেঘনাদ নামধারী পরিপূর্ণ মানুষটিকে চিনিবার জন্য প্রথম ও পঞ্চম সর্গে লিখিত মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র বৃত্তান্তও বিশেষ মূল্যবান।

মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র
মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

মেঘনাদ চরিত্র সম্পর্কে সবচেয়ে বড়ো কথা যদিও তাঁহার মহান বীরত্ব,তথাপি সর্বপ্রকার সজাগ অনুভূতির সুষমাতায় ঔচিত্যে, আচরণের সৌষ্ঠবে ও পবিত্র গার্হস্থ্য- জীবনের বিচিত্র আদর্শের সামঞ্জস্যে, তিনি যে পূর্ণাঙ্গ মনুষ্যত্বের অধিকারী, না বুঝিয়া লইয়া এই চরিত্র সৃষ্টি সম্পর্কে কোন অভিমত প্রকাশ করা নিরাপদ নহে।

যে আত্মপ্রত্যয়ী ও পৌরুষদর্পী মধুসূদনের মনের মানুষ বলিয়া আমরা ইন্দ্রজিৎকে চিনিয়াছি, সেই মধুসূদনেরও কী আত্মপ্রত্যয় ও পৌরুষ ছাড়া আর কোন চারিত্রিক বিশিষ্টতা ছিল না ?যদি জীবনে না ফুটিয়া থাকে, তাঁহার অন্তরের মনি-কোঠায় সযত্নে রক্ষিত ছিল অন্য যত রত্ন তাহা দিয়াই তো গঠিত তাঁহার মানস-পুরুষ ইন্দ্রজিৎ।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্র

 

জীবনে যাহা ফুটে না, কাব্যে তাহাই বিকশিত ও লীলায়িত হয়;বহির্জগৎ ব্যক্তিসত্তাকে বঞ্চিত করতে পারে, কিন্তু কবিসত্তা সকল বঞ্চনা তুচ্ছ করিয়া আপন মানস-পুরুষের মাধ্যমে জীবনকে সাধ মিটাইয়া উপভোগ করা যায়। ইন্দ্রজিৎ যে সর্ববঞ্চিত মধুসূদনের মানস -পুরুষ তাহা বুঝিবার ও প্রমাণ করিবার ইহাই হইল মূলসূত্র।

ইন্দ্রজিতের মধ্যে কবি সকল সাধ মিটাইয়াছেন; একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের শাখায় শাখায় স্বাচ্ছন্দে ও সগৌরবে বিহার করিয়া সর্বত্র এক নির্দোষ, কমনীয়,মোহনীয় ও বরণীয় পরিচয় দিয়া, জীবন -বিহারের মধ্যাহ্নেই সকলের মধ্যে আপনার অভাব-বোধ মুদ্রিত কোরিয়া, সকলকে কাঁদাইয়া, লোকসমাজে অবিস্মরনীয়, মনো মন্দিরে নিত্যসেব্য হইয়া নরকূলে ধন্য হওয়ার সাধ মিটাইয়াছেন।

প্রথম সর্গে দেখা যায়, লঙ্কার প্রমোদ- উদ্যানে সুখ-সম্ভোগে মত্ত থাকা অবস্থায় যে মুহূর্তে মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র শুনিলেন, যুদ্ধের মোড় ফিরিয়া গিয়াছে, এবং তাঁহার অবর্তমানে আদরের ছোটোভাই বীরবাহু হইতে হইয়াছে সেই সমরের কালাগ্নির নির্মম আহুতি অমনি-‘ছিঁড়িলা কুসুমদাম রোষে মহাবলী মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র।’ তাঁহার সোনার লঙ্কা যখন বৈরিদলবেষ্টিত তখন তিনি বামাদল -মাঝে সম্ভোগরত? যদিও ইতঃপূর্বে দুইবার প্রচণ্ড যুদ্ধে ক্লান্ত হইয়া তিনি বিশ্রামের জন্যই এই প্রমোদ- উদ্যানে আসিয়াছিলেন, তথাপি তাঁহার এই সামরিক বিভ্রান্তিতে তিনি সংকুচিত হইয়া পড়িলেন।

আত্মধিক্কারের বহ্নি- শলাকায়প্রজ্বলিত হইল যে প্রচণ্ড শৌর্য-তেজ ,মৃত্যুর পূর্বে তাহা আর কখনওনির্বাপিত হইল না। অথচ লক্ষ করবার বিষয় , এরূপ উত্তেজনায় সাধারণত যে যোদ্ধা সুলভ কঠোরতায় গোটা জীবনকে শুষ্ক ও কঠোর করিয়া ফেলে, এক্ষেত্রে তাহা হইল না; এক প্রচণ্ড মধুর সংযমের পেটিকায় ওই রুদ্রতেজ পোষিত হইতে থাকিলো, বাহিরে চলিল ধীর -মস্তিষ্কের আচরণ ও আয়োজন।

তাই চরম উত্তেজনার মুহূর্তে যখন ঘৃণা- ধিক্কারের কশাঘাতে জর্জরিত, রথারোহণে উদ্যত মেঘনাদের সম্মুখে প্রমীলা সুন্দরী আসিয়া বিরহব্যাথা নিবেদন করিলেন, তখন অন্তরের রণদামামা বাজিলেও প্রেমের মর্যাদা রাখিবার জন্য-

‘হাসি উত্তরিলা
মেঘনাদ, ইন্দ্রজিতে জিতি তুমি, সতি,
বেঁধেছ যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে
সে বাঁধে?’

কিন্তু এইটুকু মাত্র;কারণ এই সংকট- মুহূর্তে ইনাইয়া- বিনাইয়া নারী -মনোমোহন বীরের ধর্ম নহে। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা তাঁহাকে দেখি পিতৃচরণে প্রণত, অপরাধী পুত্রের ন্যায় কুণ্ঠা-পীড়িত; কেবল অনুমতির অপেক্ষা- রাঘবকে তিনি বাধিয়া আনিয়া উপহার দিবেন। আত্মপ্রত্যয়ে কী অসাধারণ দৃঢ়তা থাকিলে পুত্রের পক্ষে পিতার নিকট এই জাতীয় অনুমতি প্রার্থনা সম্ভবপর তাহাই ভাবিবার বিষয়।

পঞ্চম সর্গের পটপরিবর্তনে আমাদের দৃষ্টিপথে জাগিয়া উঠে বীরর্ষভ দেব- দৈত্য- নরত্রাস যোদ্ধৃকুল-তিলক মেঘনাদের শান্তমধুর ঘরোয়া-জীবনের এক নয়নাভিরাম দৃশ্য।

মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র কেবল বীরচূড়ামণি নহেন প্রেমিকেরও চূড়ামণি। বহির্জগতের প্রয়োজনে সংগ্রামে দুর্ধর্ষ মূর্তি ধারণ করতে হয়,কিন্তু যেখানে প্রয়োজন নাই সেখানেও ঐ দুর্ধর্ষতার ছায়া আসিয়া পড়ে,ইহাই হইল সাধারণ মানুষের কথা; কিন্তু মেঘনাদকে কবি কখনও আদর্শের সংঘর্ষে বিচলিত হইতে দেন নাই।

মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র
মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

বীরত্বের আদর্শ রণক্ষেত্রে,কিন্তু তাই বলিয়া প্রিয় -সম্ভাষণে যেখানে প্রেমিকের আদর্শ বাঞ্ছনীয় সেখানে কেন ত্রুটি থাকিবে? তাই পঞ্চম সর্গে প্রমীলার নিদ্রাভঙ্গ -দৃশ্যে মেঘনাদের কথা শুনিয়া আমরা একেবারে ভুলিয়া যায় যে, এই পুরুষটি আবার পৃথিবীর কোন প্রয়োজনে মরণ বিধ্বস্ত সমরাঙ্গনে পদার্পণ করতে পারে।

এখানে ফুটিয়াছে মেঘনাদের পুষ্পস্তবকসদৃশ কোমল- পেলব মধুময় পরম প্রেমিক -মূর্তি। আমাদের মনে পড়িয়া যায় বৃন্দাবনে কুঞ্জ- ভঙ্গ- লীলা;

“প্রমীলার কর- পদ্ম করপদ্মে ধরি
রথীন্দ্র, মধুর স্বরে হায় রে, যেমতি
নলিনীর কানে অলি কহে গুঞ্জরিয়া
প্রেমের রহস্য কথা, কহিলা,( আদরে
চুম্বি নিমীলিত আঁখি) ডাকিছে কূজনে,
হৈমবতী ঊষা তুমি রূপসি, তোমারে
পাখী- কুল !মিল, প্রিয়ে কমল-লোচন!
উঠ, চিরানন্দ মোর !সূর্যকান্তমণি-
সম এ পরাণ, কান্তা; তুমি রবিরচ্ছবি,-
তেজহীন আমি, তুমি মুদিলে নয়ন।
ভাগ্য -বৃক্ষে ফলোত্তম তুমি, হে জগতে
আমার। নয়নতারা । মহার্য রতন।
উঠে দেখ, শশিমুখি, কেমনে ফুটেছে,
চুরি করি’ কান্তি তব মঞ-্জু কুঞ্জবনে
কুসুম।”

এক বৃন্দাবন ব্যতীত এক প্রেম,আদর আমরা আর কোথায় দেখিয়াছি,? কবির প্রেম-বুভুক্ষু হৃদয় এখানে যে মেঘনাদের ভূমিকায় আকণ্ঠ প্রেমসুধা পান করিয়াছে, তাহা কে না বুঝিবে? যেমন হেনরিয়েটার উদ্দেশ্যে তাঁহার মনের কথা ছিল:

“তুমি যে আমার কবিতা,
মোর মানস-শতদলে তুমি যে বীণাপাণি
প্রতিমাসম বিরাজিতা”

তেমনি তাঁহার মেঘনাদ কে বলিতে শুনা যায়, “তেজহীন আমি, তুমি মুদিলে নয়ন।”

হেনরিয়েটা ও প্রমিলা উভয়েই প্রেমবল্লরী, মধুসূদন ও মেঘনাদরূপ রসালদ্বয়ের বল্লরীবেষ্টনের বড়োই প্রয়োজন। উভয়েরই জীবনে দারুন সংগ্রাম, কিন্তু ওই সংগ্রামে শক্তি ও প্রেরণা যোগায় প্রেমময়ী নারী ।তাই বড়ো দরদ দিয়া মধুসূদন আঁকিয়াছেন তাঁহার প্রিয়তম মেঘনাদ চরিত্র।

অথচ এই প্রেমের আবেদন অদ্ভুতভাবে পরিমিত; প্রমীলার নিদ্রাভঙ্গ হইলেই আসিল কর্তব্য পালনের আহ্বান ‘চল প্রিয়ে’এবে বিদায় হইব নমি জননীর পদে!” কী অভাবনীয় এই সামঞ্জস্য ! প্রেমের আহ্বান হইতে না হইতেই তাহার বিদায় ! ইহাতে অবশ্য মেঘনাদের আমাদের মত বিচলিত হইবার কথা নহে, কারণ উত্তুঙ্গ আশাবাদের প্রভাবে তিনি ছিলেন পুনর্মিলনে বিশ্বাসী। তাহা ছাড়া সকলের উপরে তাঁহার আত্মশক্তিতে ছিল অটল আস্থা, যাহার বলে যুদ্ধ গমনের প্রাক্কালে রোদনরতা প্রেয়সীকে স্বাচ্ছন্দে বলিয়াছিলেন “এখনই আসিব,বিনাশি রাঘবে রণে,লঙ্কা-সুশোভিনি।”

মেঘনাথ কেবল মন্দোদরীর আদরের দুলাল নহেন, তিনি ছিলেন খাঁটি মাতৃভক্ত। তাঁহার পিতৃ ভক্তির পরিচয় আমরা পূর্বেই পাইয়াছি। এই মাতৃভক্তি ও পিতৃ- ভক্তির আদর্শ মধুসূদনেরই হৃদয়-কন্দল হইতে উদ্ভূত। জীবনে তাঁহার এই ভক্তি দেখানো সম্ভব হয় নাই। নানা দ্বন্দ্ব -সংঘাতে পড়িয়া অনেক আদর্শই তিনি অবহেলা করিয়াছেন। সেই যে সমাধিস্তম্বের জন্য লিখিত কবিতায় অনুতপ্ত কবি শেষবারের মতো মাতা-পিতার পাদপদ্ম স্মরণ করিয়াছেন:

“দত্ত-কুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ী কবতক্ষ-তীরে
জন্মভূমি জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজ নারায়ণ,নামে ,জননী জাহ্নবী।”

আর কখনও তাঁহার ওই পার্থিব দেব-দেবীকে আপন হৃদয় -বার্তা জানানো হয় নাই; তাই এই মানস- পুরুষ মেঘনাদ চরিত্র-এর মধ্যে জীবনের অকর্তব্যজনিত ত্রুটি সংশোধন করিয়াছেন। পিতৃকুল ও মাতৃকুলের বংশ- গৌরবে মেঘনাদের বক্ষ স্ফীত হইয়া উঠে:

“হেন কুলে কালি
দিব কি রাগ হবে দিতে, আমি মা রাবনি
ইন্দ্রজিৎ? কি কহিবে শুনিলে এ কথা
মাতামহ দনুজেন্দ্র ময় ?রথী যত
মাতুল?”

যে বংশ -গৌরব মধুসূদন জীবনে গ্রাহ্য করেন নাই, তাহাই তাঁহার কাব্যে আদৃত হইয়াছে ।আর মাতৃভক্তি?
মেঘনাদের দৃঢ়বিশ্বাস:

“ও পদ- প্রসাদে,
চির-জয়ী দেব দৈত্য -নরের সমরে
এ দাস!”

পিতার আজ্ঞা পাওয়ার পর এখন তাঁহার প্রয়োজন মাতৃ- আজ্ঞা কারণ মাতাই সন্তানের নিকট শ্রেষ্ঠ দৈবশক্তি মাতাই মেঘনাদের পার্থিব দেবী তাই প্রার্থনা:

” দেহ আজ্ঞা তুমি-
কে আঁটিবে দাসে, দেবি, তুমি আশীষিলে?”

এইভাবে বিচার করিলে আমরা মেঘনাদবধের শ্রেষ্ঠ মেঘনাদ চরিত্র মধ্যে একই সঙ্গে পাই এক আদর্শ স্বামী,আদর্শ পুত্র,আদর্শ ভ্রাতা ও সর্বোপরি এক আদর্শ দেশভক্ত বীরপুরুষ।

কিন্তু তাঁহার আরও যে উচ্চাঙ্গের পরিচয়,তাহার জন্য আবশ্যক ষষ্ঠ সর্গের বিশ্লেষণ। সেখানে ইন্দ্রজিতের প্রথম দর্শনে আমরা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া যাই -‘নিমগ্ন তাপে চন্দ্রচূড় যেন যোগীন্দ্র ‘-কোথায় গেলে সেই প্রেমময়ীর কর্ণকুহরে প্রেম কুজন- সেই পিতার উৎসাহবর্ধনমূলক আপন শৌর্যের বিন্যাস- সেই অবোধ মায়ের প্রাণের উপযোগী আশাবাদী মধুর প্রাগল্ভতা,-তৎপরিবর্তে কোথা হইতে আসিল এই কঠোর তপশ্চরণ, নিবিড় নির্লিপ্ততা গভীর যোগ-সমাধি! রথীন্দ্র এর যোগেন্দ্ররূপ, একমুহূর্তে মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র কে এমন এক উচ্চস্তরে উন্নীত করিয়া দেয়,যাহার নাগাল পাওয়া সাধারন সংসারী মানুষের দুঃসাধ্য।

মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র
মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র

আমাদের বুঝিতে হয়, এই আধ্যাত্ম শক্তিই ইন্দ্রজিতের সাফল্যময় জীবন-রহস্যের মূল সূত্র।

জীবনের সর্বত্র আদর্শস্থাপন ও বিভিন্ন আদর্শের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধান বুঝি তাহারই পক্ষে সম্ভব, যাহার আছে এই আধ্যাত্বিক বন্ধন।

তবে যদি অতি- মানবীয় শক্তির চক্রান্ত মানুষকে বিকল করিতে থাকে, মানুষকে যদি যনমাত্র করিয়া নিয়তি হয় যন্ত্রী,তবে আর সাফল্যের অবসর কোথায়? কিন্তু তবু সেই নিষ্ঠুর নিয়তির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত মানুষের যে অন্তর-ঐশ্বর্য মেঘনাদ চরিত্র-এ স্ফুরিত হইয়াছে, তাহা চরিত্র – স্রষ্টার অশেষ কৃতিত্বের পরিচয় বহন করে।

দৈবনিষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ কীরূপে বিশ্বাস করবেন যে,দেবতাদের মধ্যে রেষারেষির ফলে তাঁহার নিজস্ব উপাস্যকে শক্তিহীন হইতে হইবে? তাই লক্ষণকে তিনি ছলনাময় বিভাবসু ছাড়া আর কিছু ভাবিতেই পারেন নাই! কিন্তু পরে যখন লক্ষণের আত্মপরিচয় পাইলেন, তখন যে হৃদয় কখনও ভয় বলিয়া কোন বস্তুকে গ্রাহ্য করে নাই, তাহাতেই লাগিল প্রথম ভয়ের শিহরণ!’সভয়ে হইল আজি ভয়শুন্য হিয়া’।

এ শিহরণ শত্রুকে গৃহ-মধ্যে দেখিয়া নয়,দৈবশক্তির শৈথিল্য দেখিয়া। কিন্তু তবুও নির্বীর্য আত্মসমর্পণ নহে;চরম দৈবদুর্গতির মধ্যেও সংগ্রামের বীরচিত প্রয়াস।

লক্ষণের সেই উদ্ধত অমার্জিত আস্ফালন-‘কৃতান্ত আমি যে তোর, দুরন্ত রাবণি!’ ইত্যাদির পরের অভাবনীয় সংযম ও প্রশস্ত ঔদার্যের বশবর্তী মেঘনাদের মুখে যে কথাগুলি আমরা শুনতে পাই এবং যে শিষ্টতা সৌজন্য, নীতিবোধ ও সমাহিতচিত্ততা উহার ছত্রে ছত্রঅনুপ্রাণিত,রিপুতাড়িত পার্থিব মানব কেন সর্বগুণাধার দেব-বীরের পক্ষেও সুদুর্লভ:

” সত্য যদি রামানুজ তুমি, ভীমবাহু
লক্ষণ, সংগ্রাম-সাধ অবশ্য মিটাব
মহাহবে আমি তব; বিরত কি কভু
রণরঙ্গে ইন্দ্রজিৎ? অতিথেয়-সেবা
তিষ্ঠি,লহ,শূরশ্রেষ্ঠ প্রথমে এধামে-
রক্ষোরিপু তুমি, তবু অতিথি হে এবে।
সাজি বীর- সাজে আমি।নিরস্ত্র যে অরি,
নহে রথিকুল- প্রথা আঘাতিতে তারে,
এ বিধি, হে বীরবর, অবিদিত নহে
ক্ষত্র তুমি, তব কাছে;- কি আর কহিব?”

ইহা ভীরুর কোমলতা নহে, শক্তিমানের ঔদার্য ।লক্ষ্মণ বলিয়াছেন , ‘দেবাদেশে রনে আমি আহ্বানি তোরে।’ -কিন্তু এ কীরূপ আহ্বান? অঙ্গে যাহার কৌষিক বস্তু, কৌষিক উত্তরী,চন্দনের ফোঁটা ভালে, ফুলমালা গলে, কুশাসনে উপবিষ্ট হইয়া যে ইষ্টদেবের ধ্যানে নিমগ্ন- তাহাকে আকস্মাৎ একজন সশস্ত্র প্রহারোদ্যত প্রতিপক্ষ যদি তৎক্ষণাৎ রণে আহ্বান করে, তবে কী তাহা বিদ্রুপের ন্যায় শুনায় না ? রণই যাহার রঙ্গ,যুদ্ধই যাহার লীলা,তাহার নিকট রণের আহ্বান তো উল্লাসকর; কিন্তু পূজার সাজে কী যুদ্ধ হয় !তাই লক্ষণের মূঢ়তায় ও বর্বরতায় বিচলিত না হইয়া প্রশান্ত ভঙ্গিতে ইন্দ্রজিৎ কেবল বীরসাজে সজ্জিত হওয়ার সময় চাহিলেন।

নচেৎ ‘ বিরত কি কভু রণরঙ্গে ইন্দ্রজিৎ?’-ইহা অপেক্ষা বড়ো সত্য আর কি আছে? তবে যে সময় তিনি রণসাজ করিবেন সে সময়টুকু লক্ষণের কীরূপ কাটিবে? তিনি কী হিংস্র পশুর ন্যায় কেবলই গর্জাইতে থাকিবেন? না; হিংস্রতা ব্যতীত আর কোন মনোভাব তখন হয়তো লক্ষ্মণের পক্ষে ধারণাতীত , কিন্তু সংযমের প্রতিমূর্তি ও পরম বিজ্ঞ মেঘনাদের পক্ষে তাহা নহে।

তাঁহার নিকট লক্ষ্মন রক্ষোরিপু হইলেও সর্বাগ্রে অতিথি; সুতরাং লক্ষ্মণ ততক্ষণ মেঘনাদের আয়োজিত অতিথেয় সেবা গ্রহণ করুন – ইহাই হইল সেই পুরুষসিংহের বিনীত প্রস্তাব। নচেৎ তাঁহার মাননীয় প্রতিদ্বন্দী লক্ষ্মণ নিরস অরিকে আঘাত করিয়া রথিকুল-প্রথা-লঙ্ঘনের কর্তৃক গায়ে মাখিবেন, ইহা যে মেঘনাদকে ব্যথিত করে।

তিনি যেন লক্ষ্মণকে এই কলঙ্ক-স্পর্শ হইতে বাঁচাবার জন্যই এই প্রস্তাব করিলেন; তাঁহার প্রস্তাবের মধ্যে কোনো উদ্ধত ওস্তাদি নাই; লক্ষণকে উপদেশ দেওয়ার স্পর্ধা তাঁহার নাই; লক্ষ্মণ যে এই রথিকূল-প্রথা ভালোই জানেন, ইহাই মেঘনাদের বিশ্বাস; কারণ অপরের ছিদ্রানুসন্ধানের নীচতা তাঁহার নাই; তবে হয়তো পারিপার্শ্বিকের চক্রান্তে লক্ষ্মণের সাময়িক মোহ দেখা দিতে পারে, তাই মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র সহৃদয় বন্ধুর ন্যায় কেবল তাঁহাকে স্মরণ করাইয়া দিতে চাহেন সেই পরিচিত প্রশস্ত বীর- পন্থা।

এখানেই আমরা মেঘনাদের চারিত্রিক সমুন্নতির তুঙ্গ-শৃঙ্গে আসিয়া পৌঁছিলাম । এ সমুন্নতি,এক কথায়, অতিমানবীয়। যে এই মাত্র অকারণ ‘দুরন্ত’, ‘মদমত্ত’, ‘মূঢ়’, ‘দুম্মতি’, ইত্যাদি বর্বর ভাষা ব্যবহার করিল, তাহাকেই, তিরস্কারের পর্যাপ্ত কারণ থাকা সত্ত্বেও ‘ভীমবাহু লক্ষণ’,’শূরশ্রেষ্ঠ’, ‘বীরবর’ ইত্যাদি সসম্ভ্রম ভাষণে আপ্যায়িত করা একমাত্র মহাপুরুষের পক্ষেই সম্ভব।

কিন্তু ‘মরি অরি পারি যে কৌশলে ।’-এই নীচমন্ত্রে দীক্ষিত লক্ষ্মণকে সহ্য করাও তো ক্লীবের লক্ষ্মণ; আর ওদিকে পরপদলেহী স্ব- জাতিদ্রোহী কাপুরুষ খুল্লতাত বিভীষণকে সহ্য করাও মেঘনাদের পক্ষে সম্ভব নহে;তাই শেষাংশে আমরা পাই তীব্র ভৎসনা ও নীতিবোধের এক সুদীর্ঘ অগ্ন্যুদগীরণ।

লক্ষ্মণের বেলা যেমন, বিভীষণের বেলাতেও তেমনি; প্রথমে মেঘনার খুল্লতাতের অন্তরে স্বাজাত্যবোধ ও দেশাত্মবোধ পুনরুজ্জীবিত করিবার জন্য বিনয় নম্রতা পূর্ণ জানগর্ভ প্রস্তাব ও প্রার্থনা নিবেদন করেন কিন্তু নিরুপায় হইয়াই তাঁহাকে কঠোর বাক্য প্রয়োগ করিতে হয়।

আরো পড়তে পারেন: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র

যাহা হউক এই সর্বগুণাধার পুরুষোত্তমকে ও যে কেবল মায়ার মায়য় বিকল হইতে হইল, এইখানেই মেঘনাদের Tragedy সকরুণ হইয়া উঠিয়াছে। নিরস্ত্র হওয়া সত্বেও অপরিমেয় শক্তির শেষ বহর প্রয়োগ করিবার জন্য যখন এই বীর-কেশরী ভীমনাদে গর্জন করিয়া লক্ষ্মণের দিকে ধাবিত হইলেন, তখন লক্ষ্মণ সশস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও কি ঘটিত বলা যায় না, কিন্তু:

“মায়ার মায়ায় বলী হেরিলা চৌদিকে
ভিষণ মহিষারূঢ় ভীমদন্ডধরে;
* * *
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি দাঁড়াইলা বলী
নিষ্ফল, হায় রে মরি, কলাধর যথা
রাহুগ্রাসে।”

এত বড়ো বীরের এই নিষ্ফলতা সকলেরই অন্তর করুন রসে ভরাইয়া দেয়। শমন-জয়ী মেঘনাদ/মেঘনাদ চরিত্র যদি বুঝতে পারিতেন কেন তাঁহার এই পরাজয়, তবে কোনো আক্ষেপ থাকিত না, কিন্তু:

” কি পাপে বিধাতা
দিলেন এ তাপ দাসে বুঝিব কেমনে?”

এইখানেইTragedy। হয়তো কবির নিজের জীবনেও এই জাতীয় ব্যর্থতা- জনিত ছিল এক পর্বতপ্রমাণ আক্ষেপ,তাই তাঁহার হাতে এত করুন হইয়া উঠিয়াছে মেঘনাদ চরিত্র-এর পরিণতি,আর, তাই তিনি নিজেও বলিয়াছেন:
“It was a struggle whether Meghnad will finish me or I finished him. thank Heaven, I have trumphed, He is dead. …. It cost me many a tear to kill him.”

আমাকে অনুসরণ করতে পারেন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামটুইটারে

Spread the love

1 thought on “মেঘনাদবধ কাব্যের মেঘনাদ চরিত্র”

  1. Pingback: মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণ চরিত্র » Debota Hembram

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *